কাইজ্জা ফ্যাসাদ মিলমিশ

হাসনাইন খুরশেদ


ভিপির গায়ে হাত তুলে তুমি খুব অন্যায় করেছো। আমরা ঠিক করেছি, এর দায়ে তোমাকে কলেজ থেকে বের করে দেবো। একটু থেমে প্রিন্সিপ্যাল স্যার বললেন, তোমার কিছু বলার থাকলে বলো।
স্যারের চোখে চোখ রেখে আমি বললাম,
-সেটা আপনাদের বিষয় স্যার। আমার কিছু বলার নেই। তবে অন্য একটা কথা আমাকে বলতেই হবে।
-অন্য আবার কি! আচ্ছা.. বলো।
-দানবীর কলেজের ভিপির সম্মানহানির দায়ে আমাকে বহিস্কার করতে চাচ্ছেন, করুন। আমি জানতে চাই, দানবীর সাহেবের সম্মানহানির দায়ে কাকে কি শাস্তি দিচ্ছেন? তাঁর মতো বরেণ্য মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের অহংকার। তাঁকে কি আমরা যথাযথ সম্মান দিচ্ছি!

থমকে গেলেন প্রিন্সিপ্যাল স্যার। অন্যরাও চমকে গেলো। কারো মুখে কোন কথা নেই। পুরো রুম জুড়ে নেমে এলো নিরবতা।ভিপি খালেককে পেটানোর দায়ে সালিস বসেছে। প্রিন্সিপ্যাল স্যারের রুমে আমাকে ডেকে আনা হয়েছে।আমি ঢুকতেই কটমট করে তাকালেন খালেক ভাই। প্রচণ্ড রাগে লাল হয়ে ওঠা তার চোখ বলছে, সুযোগ পেলেই আমাকে পিটিয়ে ছালা বানাবেন। ছিঁড়ে ত্যানা ত্যানা করে ফেলবেন।

আমি ওসবের পরোয়া করি না। আমার প্রবল বিশ্বাস, ভয় পেলে কিছুই জয় করা যায় না। শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় সাহসী মানুষ।সারা রুমে চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম, শিক্ষক সমিতির তিন গ্রুপের তিন নেতা ফরিদ স্যার, জহির স্যার আর হেলাল স্যারও রয়েছেন। তাদের চোখে শেয়ালের ধূর্ততা। প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেলো নবনির্বাচিত জিএস আবিদ ভাইয়ের ঠোঁটে। তার উজ্জ্বল চোখ জোড়া আমাকে কেমন যেনো সাহস যোগাচ্ছে। প্রিন্সিপ্যাল স্যারের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম,
-দানবীর সাহেব এই কলেজটা করেছিলেন বলেই আপনি আজ প্রিন্সিপ্যাল। দানবীর সাহেবের সম্মান রক্ষার দায় আমার চেয়ে তো আপনার অনেক বেশি। তাই না স্যার?
-বেয়াদব ছেলে! খালি চ্যাটাংচ্যাটাং কথা কয়! ধমকে উঠলেন ফরিদ স্যার,
-ও তো উল্টা আমাদের বিচার করতে চায়! আমি আগেই বলেছিলাম, ওর কথা শোনার কিছু নাই। সোজা বের করে দেন।

হেলাল স্যার আর জহির স্যার যেনো প্রতিযোগিতায় নামলেন। নতুন ভিপির অনেক কাছে চলে গেছেন ফরিদ স্যার। তাদের আর পিছিয়ে থাকার উপায় নেই। ভিপিকে পক্ষে টানতে পারলে সব কর্তৃত্ব চলে যাবে ফরিদ স্যারের হাতে। সেটা তো তারা হতে দিতে পারেন না।
হেলাল স্যার বললেন, আর বেয়াদবি দেখতে চাই না। তুমি এখন যাও। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবো।
-সিদ্ধান্তের আবার কি আছে! প্রচণ্ড উস্মা ঝরলো জহির স্যারের কন্ঠে, বহিস্কারপত্রটা তৈরি করে এখনই ওর হাতে ধরিয়ে দেন।
আমি শক্ত গলায় বললাম,
-আমাকে যা ইচ্ছা করেন। দানবীর সাহেবকে অবমাননার বিচার আপনাদের করতেই হবে। নইলে..
-নইলে! নইলে কি! কি করবে তুমি! আমাদের হুমকি দিচ্ছো!
হেলাল স্যারের চিৎকার থামিয়ে দিলেন প্রিন্সিপ্যাল স্যার। বললেন, আপনারা শান্ত হোন। আমরা অবশ্যই নির্মোহভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবো। আমার দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, ও যা বলছে, তাতে যুক্তি আছে। দানবীর সাহেবের অবমাননা মেনে নেয়ার কোন কারণ আমাদের নেই। এটা মেনে নিলে তো আমাদের কারোরই আর এই কলেজে থাকা উচিত না। আবার নেমে এলো পিনপতন স্তব্ধতা। তিন স্যার এমনটা কল্পনাও করতে পারেননি। তারা হতভম্ব হয়ে গেলেন। প্রিন্সিপ্যাল স্যারের মুখের ওপর পাল্টা কিছু বলার সাহস তাদের কারোই নেই। রাজনীতিতে দারূণ চৌকশ আবিদ ভাই। অত্যন্ত ঝানু খেলোয়াড়। তার সংগঠনটা খুব দুর্বল হলেও ভোটে বেশ বড় ব্যবধানে জিতেই তিনি জিএস হয়েছেন। আবিদ ভাই জিতেছেন বড় দুই সংগঠনের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে। ওই দুই সংগঠনের সাত নেতাকে নানাভাবে উসকে দাঁড় করিয়েছেন জিএস পদে। তাদের নামিয়ে দিয়েছেন পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই আর ভোট কাটাকাটির দূরন্ত খেলায়। আর সেই খেলায় চমক জাগানো গোল করেছেন ছাত্র-রাজনীতির সুযোগসন্ধানী এই স্ট্রাইকার। সবাইকে চমকে দিয়ে কলেজ সংসদের জিএস নির্বাচিত হয়েছেন দৃশ্যতঃ প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে থাকা আবিদ হোসেন।

আবিদ ভাইয়ের সামনে এবার এসেছে আরেক মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগ তিনি হাতছাড়া করবেন! প্রশ্নই আসে না।
-এতক্ষণ তো আপনারাই বললেন স্যার। এবার আমাকে বলতে দিন, ভিপির গায়ে হাত তুলে শুচি অন্যায় করেছে। ওকে বহিস্কার করুন।
রাজনৈতিক বক্তৃতার ঢংয়ে গলা চড়ালেন আবিদ ভাই, আপনারাই শিখিয়েছেন স্যার, ক্রিয়ার চেয়ে প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা বেশি হয়। ভিপি সাহেব যে ক্রিয়া করেছেন, শুচি তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় গায়ে হাত তোলাটা বাড়াবাড়ি হয়েছে। কিন্তু ক্রিয়াটা ছিলো আরো অনেক খারাপ। আমরা ছাত্রসমাজ মনে করি, শুচির চেয়ে খালেক সাহেবের অন্যায়ের মাত্রা অনেক, অনেক বেশি।
তুখোড় ছাত্রনেতা, নবনির্বাচিত জিএস আবিদ হোসেন বলে চললেন, দানবীর সাহেবের অবমাননা আমরা ছাত্রসমাজ সহ্য করবো না। ভিপি খালেক ও শুচি- দুজনকেই এই মূহূর্তে বহিস্কার করতে হবে। শুচিকে মাফ করলে করা যায়, কিন্তু ভিপি খালেকের বহিস্কার আমাদের একমাত্র দাবি। এ দাবি মানতেই হবে। এর বাইরে কোন কিছুই আমরা ছাত্রসমাজ বরদাশত করবো না।
পুরো পরিবেশটাই বদলে গেলো। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে অনিবার্য হয়ে উঠছে ভিপি খালেকের বহিস্কার।

ফরিদ স্যার, জহির স্যার, হেলাল স্যার- তিনজনই খুব বিব্রত। দারূণ অস্বস্তিতে পরেছেন। তারা বুঝতে পারছেন, এমন কিছু বলা ঠিক হবে না যেটা জিএস-কে ক্ষুব্ধ করতে পারে। বলা তো যায় না, যদি জিএস আবিদ হোসেনের হাতেই চলে যায় কলেজ-সংসদের একক কর্তৃত্ব!
প্রিন্সিপ্যাল স্যার নিরবে সব শুনছেন। কিছু একটা ভাবছেন তিনি। এই কলেজে তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
আমনের মুহে ত অহনো কাইলকার গরুর ছালুন লাইগ্যা রইছে! অ আবিদ ভাই, মুখটা ভালা মতন মুইচ্ছা কথা কন..
বলতে বলতে খালেক ভাই তার বুকের জেব থেকে বের করলেন টকটকে লাল রুমাল। এগিয়ে গিয়ে আবিদ ভাইয়ের মুখ মুছে দিতে লাগলেন। আর কানের কাছে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে কি যেনো বললেন।
আবিদ ভাইয়ের চোখ চকচক করে উঠলো। উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে না পেরে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, দ্যাইখ্যান, কথা যুমুন ঠিক থাহে।
খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলেন খালেক ভাই। থাকব.. থাকব.. স্যাররা লরলেও আবদুল খালেকের কথা লরত না। ট্যাহা কুন জনমের লাইগ্যা.. হেঃ..হেঃ..হেঃ..

এবার প্রিন্সিপ্যাল স্যারের দিকে তাকালেন খালেক ভাই, আমনেরা ইতা কিতা শুরু করছেন স্যার। কিয়ের বিচার-সালিস বওয়াইছেন। জানেন অইত্ত শুচি আমার আপনা ভাই। আমরা বাওনবাইরার মানুষ। ভাইয়ে ভাইয়ে কাইজ্জা-ফ্যাসাদ করুম। আবার মিলমিশ হমু। ইতা নি কলেজের কুনু ব্যাপার! হাত ধরে টান মেরে আমাকে চেয়ার থেকে উঠালেন খালেক ভাই। বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন, কি রে শুচি, তুই কিতা কস? কাইজ্জা করন কি ভালা? ল, ইতা বাদ দেই। আমার কাঁধে হাত রেখে খালেক ভাই বলে চললেন, মাইয়ারা অনেক আশা লইয়্যা চাইয়া রইছে। ল.. দ্যাইখ্যা আই আজহার কন্ডাক্টর মাইয়ারার বিল্ডিংয়ের কাম কতটুক আগ্যাইছে..

জোর করেই আমাকে নিয়ে খালেক ভাই রওয়ানা দিলেন দরোজার দিকে।
-ভুইল্যা যাইয়েন না, আমারে কিন্তু সব কামে লগে রাহন লাগব। মিলমিশ ছাড়া কুনু হাওন-দাওন নাই।
বলতে বলতে আবিদ ভাইও উঠে এলেন। আরেক পাশ থেকে খালেক ভাইকে জড়িয়ে ধরে পায়ে পা মেলালেন। গলাগলি করে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন খালেক ভাই আর আবিদ ভাই। আমাকেও সাথে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রিন্সিপ্যাল স্যার বিস্ময় ভরা চোখে সব দেখছেন। তিনি দেখছেন, একে একে তাঁকে সালাম জানিয়ে আমাদের পেছনে পেছনে হাঁটছেন তাঁর তিন সহকর্মী- ফরিদ স্যার, জহির স্যার আর হেলাল স্যার।

চলবে…

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...