আসিতেছে কিশোর প্রেম

হাসনাইন খুরশেদ


হাতির মতোন শরীর। অথচ ছুটছেন হরিণের মতোন। সবকিছু পেছনে পড়ে থাকছে। কেউ তাকে পাচ্ছে না। তিনি ছুটছেন অবাক করা ক্ষীপ্রতায়। আমরা দেখছি, সাতটা দিন ধরে মহাব্যস্ত খালেক ভাই। কি যে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করছেন। রাত-দিন একাকার করে ফেলছেন। পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন। কেনো তার এতো ছোটাছুটি, আমরা জানি না। কেউ জানে না।

খালেক ভাইকে এক সকালে কলেজে একাকি পেলাম আমি আর পার্কি। জানতে চাইলাম, কিতা অইছে খালেক ভাই? অত দৌরাইতাছেন ক্যারে?
-অ শুচি, পার্কি.. তরা ত ভাই জানসই, মাইয়ারা কত্ত আশা লইয়া আমারে ভুট দিছে। দশ-বারো দিন গেল গা, হেরার বিল্ডিংডার কাম শুরুই করতাম পারলাম না। এইডা কুছতা হইল!
-এইডার লাইগ্যা মাইয়ারা আপনেরে মারত না। আর কিতা আছে হেইডা কন..
-উঁ.. আছে.. তরা ত আমার আপনা ভাই.. তরার লগে কুছতা লুকাই না। এইডাও লুকাইতাম না। আরো একটা ব্যাপার আছে..
-হেই ব্যাপারডা কইয়া ফালান খালেক ভাই।
-কাউরে কুছতা কইস না কইলাম। কাকপক্ষীও যুমুন না জানে..
-কেউ জানত না। কন।
লজ্জ্বায় কেমন বেগুনি হয়ে গেলো খালেক ভাইয়ের কৃষ্ণকালো মুখমণ্ডল। আটকে আসছে তার কথা। তোতলাতে তোতলাতে বললেন, একটা বই বানাইতাম..
-বই! মানে.. সিনেমা! আপনে সিনেমা বানাইতেন!
-হ, একটা বই বানাইতাম।
পার্কি জানতে চাইলো, কিয়ের সিনেমা বানাইবেন আপনে? ক্যামনে বানাইবেন?
-কমু নে, তরারে সব-অই কমু। আইজগা না.. তারা আছে রে ভাই। অহন যাই।
আমরা দেখলাম, হনহন করে গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছেন খালেক ভাই। আর কাক-কণ্ঠে গাইছেন-

কোই পরদেশী আয়া পরদেশ ম্যায়..
ও.. দেশ বানায়া.. পরদেশ ম্যায়..

ভিপি সাব.. ভিপি সাব.. ডাকতে ডাকতে ছুটে গেলেন কাশেম সাহেব। আবুল কাশেম। দানবীর আবদুল করিম কলেজের প্রধান হিসাব রক্ষক। হাতির শুঁড়ের মতো খালেক ভাইয়ের হাত। সেই হাত আঁকড়ে ধরে কাশেম সাহেব বললেন, চেয়ারে বইয়া পরথমেই একাউন্টসের লগে সম’ দিয়ন লাগে। আপনে ত আমার লগে অহনও বইলেন না!
বমু নে.. পরে বমু।
-জরুরি কাম আছিল ভিপি সাব। একটা জরুরি কথা কওন খুব দরকার।
-আপনের আবার জরুরি কিতা!
-একটু আলগা বইতে হইব। ব্যাপারডা গুপন..
-গুপন! হেসে উঠলেন খালেক ভাই, বুড়া বয়সে পিরিতি করতাছেন নি?
ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালেন কাশেম সাহেব। মিনমিন করে বললেন, অহন আমারে একটু সম’ দিয়া যান। আখেরে আপনের-অই লাভ।
-দুরু মিয়া, অহন পারতাম না..
গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেলেন খালেক ভাই।

পরদিন পড়ন্ত বিকেল। মাঠ থেকে উঠে আসছি আমরা। ঘামে ভিজে গেছে জার্সি, শর্টস। এডিডাসের বুটগুলো খুলে ব্যাগে ভরেছি। স্পঞ্জের স্যান্ডেল পায়ে।
-ছুটে এলো ড্রাইভার কেরামত, স্যারে আপনেরারে বুলাইছে.. ওই যে গারিত বইয়া রইছে..
আমাকে আর পার্কিকে টেনে নিয়ে গেলো নীল জীপটার কাছে। খালেক ভাইয়ের জোরাজুরিতে উঠতেই হলো। জীপ ছুটলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ছাড়িয়ে। ছুটলো সিলেট হাইওয়ে ধরে।
-ল, একটু ঘুইরা আই.. আর কথা কই..
-মোদক পুস্কুনিত গোছল করতাম। সারা শরীর ঘাইম্যা রইছে।
-কুছতা হইত না.. তরারে কথাডা অইত্ত কইতাম পারলাম না..
-আবার কুন কথা!
-আরে, কাইলকা বেইন্নালা একটা কথা কইছিলাম না.. হেইডা..
এবার বুঝলাম। খালেক ভাই কথা বলতে চান। তার সেই কথার বিষয়- বই নানানো। সিনেমা বানানো।
-আগে কন ত, সিনামার ভূত আপনের মইদ্যে ঢুকল ক্যামনে?
লজ্জ্বা পেলে খালেক ভাইয়ের সারা মুখ বেগুনি হয়ে যায়। কথা বলতে গিয়ে তোতলাতে থাকেন। এখনও তা-ই ঘটলো।
-দে.. দে.. দেবছ্ছিরি.. থুক্কু, থুক্কু.. দেবী.. হেইদিন কইতাছিল..
-দেবশ্রী! মানে আগরতলার ওই মাইয়াডা! পার্কি আঁৎকে উঠলো, হের কথায় আপনে সিনামা বানাইবেন! সিনে্ামা বানানো কি অত সস্তা! কেমনে বানাইবেন আপনে!
-আমি আবার ক্যামনে বানামু! বই বানাইব পরিচালক। আমি হমু পরযজক। বই বানাইতে টাহা খাডামু।
-পরিচালক! প্রযোজক! ইতা আপনে শিখছেন কই!
আমার কথার জবাবে খালেক ভাই বললেন, মন্টু সাবের নাম ত হুনছস.. অনেক ভালা বই বানায়.. জানস ত, তাইনের বাড়িও আমরার বাওনবাইরা। আমরার হারুন ত তাইনের গুষ্ঠিরই পোলা।
-কান্দিপাড়ার হারুন! ওইডা ত বাটপার!
-হেই বদনাম একটু আছে.. তয় আমার লগে সাহস করত না। প্রচণ্ড আস্থা খালেক ভাইয়ের কণ্ঠে, হারুন কইছে, মন্টু সাবের ধারে লইয়া যাইব। হে-অই রাজি করাইব।
অবাক হচ্ছি আমরা। খালেক ভাই এখন দানবীর আবদুল করিম কলেজের নির্বাচিত ভিপি। এবার হতে চাচ্ছেন সিনেমার প্রযোজক।
-হারুন কইছে, মন্টু সাব হইব পরিচালক। আর আমি হমু পরযজক। বইয়ের ট্যাহা আমি দিমু। নায়ক-নায়িকাও আমিই দিমু।
-পারতেন না। সরাসরি নাকচ করে দিলাম আমি, মন্টু সাবে রাজি হইত না। সিনেমার নায়ক-নায়িকা তাইনে নিজের পছন্দে নিব।
-এইডা হারুনও কইছে। হে বেবাকরে চিনে। কইছে, তাইনে রাজি না হইলে অন্য পরিচালক দিব।
-হাছাই আপনে সিনামা বানাইবেন?
-হ, বানামুই.. দেবীরে আমি কথা দিছি.. অমন একটা মাইয়ারে কথা দিয়া ত আর লরন যায় না!
আমার দিকে তাকিয়ে আবেগের বশে বলেই ফেললেন, তুই ত জানস-অই, হে আমারে কইছে, খালেকদা, আই লাব ইউ..
-হোয়াট! চমকে উঠলো পার্কি, কি কইছে মাইয়াডা?
-কইছে, খালেকদা, আই লাব ইউ..
-কি রে শুচি, কইছে না!
বিস্মিত পার্কি আমার দিকে তাকালো। আমি হেসে ফেললাম।
খালেক ভাই, আপনে কইলেন কেউরে কিচ্ছু না কইতে..। কিছুই শুনছেন না খালেক ভাই। ভালোবাসার ভিন্ন এক জগতে ভেসে যাচ্ছেন। তাকে বাস্তবতায় টেনে এনে বললাম, সিনেমা বানাইতে ত অনেক ট্যাহা লাগে, এইডা জানেন?
-হ.. হারুনে কইছে, পঞ্চাশ লাখ ট্যাহা লাগবই..
পঞ্চাশ লাখ! এত্ত ট্যাহা কই পাইবেন? দিব আপনের মা-বইনেরা? আপনের আব্বায় দিব?
-চুপ..চুপ..
আঁৎকে উঠে আমার মুখ চেপে ধরলেন খালেক ভাই। যেনো আমার কথা শুনে ফেলবেন তার আম্মা-আব্বা আর বোনেরা! তারা যেনো এই গাড়িতেই আছেন! ফিসফিস করে খালেক ভাই বললেন, হেরা হুনলে আমারে মাইরাই ফালাইব। বইডা আগে বানাইয়া লই। তারপরে যা অয় অইব..
পার্কি জানতে চাইলো, তাইলে ট্যাহা পাইবেন কই?
-কাম শুরু করলে ভিপির ট্যাহার সমস্যা নাই। বলে চললেন খালেক ভাই, আজহার কন্ডাক্টরে কইছে- ভিপি হইল ট্যাহার খনি। যেমনে পারেন অর্ধেক ট্যাহা দিয়া বিল্ডিংয়ের কামডা শুরু কইরা দ্যান। তারপরে দেখবেন, খনির দরজা খুইল্যা যাইব.. আইতে থাকব ট্যাহা আর ট্যাহা..

আশ্চর্য্য! খালেক ভাই এসব কি বলছে! তাকে কি বোকা বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আজহার কন্ট্রাক্টর!
-আজহারের কথায় আমি দৌরাইতাছি। মাইয়ারার বিল্ডিংয়ের কামডা শুরু কইরা দিমু। কাইন্দা-কাইট্টা যেমনে পারি, অর্ধেক ট্যাহা জোগার করমুই করমু। হেরে অহন দিয়ন লাগব দশ লাখ।
শুনতে শুনতে ভড়কে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে, আজহার কন্ট্রাক্টর টাকা মেরে দেবে। আরো কত কিছু না জানি ঘটবে। নাহ, এসবের ধারে-কাছেও আমি থাকবো না।
-হুনছ না, বইয়ের সব কিচ্ছু আমি ঠিক কইরা ফালাইছি। নায়িকা ত ঠিক করাই আছে.. আমার দেবী..
এসব শুনে রাগ উঠছে আমার। সেই ভোরে দেখেছি, দেবশ্রীর রুম থেকে চোরের মতো বেরিয়ে গেলো দীলিপদা। এমন একটা মেয়েকে নায়িকা বানাতে খরচ করবে পঞ্চাশ লাখ টাকা!
-দেবী ত অনেক ছুট্টু। মাত্র ম্যাট্রিক দিছে। অত ছুট্টু নায়িকার লগে ছুট্টু নায়কও লাগব..
রাগ চেপে মজা করলাম। বললাম, নায়ক পাইবেন কই?
-আমরার হাতে ত আছে-অই.. পোলাডা লম্বা-চওরা আছে, দেখতে-হুনতেও ভালা.. দেহিস, মানাইব..
-কিতা কইতাছেন খালেক ভাই! কার কথা কইতাছেন?
-আরে, পরবাল.. তরার দুস্ত পরবাল.. পরবালরে বানামু নায়ক। আর নায়িকা আমার দেবী..
-প্রবাল হবে সিনেমার নায়ক! দেবশ্রীর নায়ক!
-খালেক ভাই জানালেন, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হবে এই সিনেমা। দীলিপদাও কিছু টাকা খাটাবেন।
দেবশ্রী শুধু দেখতেই সুন্দর না, দূর্দান্ত নাচতে জানে। সেই রাতে তিতাস বোর্ডিংয়ে দীলিপদার রুমে নেচেছিলো। টু-ইন-ওয়ানে হিন্দি গান বাজিয়ে তালে তালে নেচেছিলো। ওর নাচ দেখে পাগল হয়ে গেছেন খালেক ভাই। পাগল হয়ে কথা দিয়েছেন, পূরণ করবেনই দেবশ্রীর স্বপ্ন। তাকে নায়িকা বানাতে সিনেমায় টাকা খাটাবেন। সেই সব কিছুই আমাদের খুলে বললেন খালেক ভাই। প্রবাল আর দেবশ্রী। বাওনবাইরার নায়ক আর আগরতলার নায়িকা। স্বদেশী নায়ক আর পরদেশী নায়িকা। খুব মজা পাচ্ছি আমরা। হাসি চেপে রেখে পার্কি বললো, শুচি.. আমি.. আমরা না ক্যারে?
তরার ত কেউ নাই। যদি দেবীরে লইয়া ভাগছ..। হাসিতে ফেটে পরলাম আমরা।

-আমরারে বিশ্বাস করতাছেন না। দেইখ্যান, প্রবালই আপনের দেবীরে লইয়া ভাগব। তহন আপনের কিতা অইব?
না.. না.. ভাগত না.. পরবাল ভালা পুলা.. আর আমি লুক লাগাইছি.. হবর লইছি, হে সায়লার লগে পিরিত করে..

আমরা অবাক। খালেক ভাই আমাদের প্রেম-প্রীতির খবর নিতে গোয়েন্দা লাগিয়েছেন!
পার্কি মাথা নেড়ে বললো, প্রবাল নায়ক হইলে সায়লারে আর চিনতই না।
চিন্তিত হয়ে পরলেন খালেক ভাই, কওয়ন যায় না। বেঈমানি করতেও পারে। মাইয়াডা অত সুন্দর..
কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠলো খালেক ভাইয়ের। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, লইয়া নি যায়গা এই ডর আমারও আছে। হের লাইগাই ত ঢাকার নায়ক লইতাম না.. আইচ্ছা, তরা একটু দেইখ্যা রাহিস।
এবার আর চেপে রাখতে পারলাম না। হো.. হো.. করে হেসে উঠলাম আমরা।
বললাম, সব কুছতাই ত ঠিক কইরা ফালাইছেন। আপনের বইয়ের নামডা ঠিক করছেন নি?
-হ, হারুনের লগে শলা-পরামর্শ কইরা এইডাও ঠিক করছি। আমরার নায়ক-নায়িকা ত ছুট্টু..
-হ, প্রবাল আর দেবশ্রী ত ছুট্টু-অই..
উদাস কণ্ঠে আমাদের খালেক ভাই বললেন, হেই চিন্তা কইরাই বইডার নাম রাখছি- ‘কিশোর পেরেম’।

চলবে…

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...