আপনে ডরাইতাছেন ক্যারে?

হাসনাইন খুরশেদ


-মামু পৌঁছছে যেইহানে.. ভাইগনা পৌছব সেইহানে.. খারা না বড় অইয়া লই। তরা দেখবি, আমিও মামুর লাহান সিনামা বানামু। বেলাকে টিকেট কাইট্যা মাইনষে আমার সিনামা দেখব।

প্রায়ই এ কথা বলে শাফি। ওর স্বপ্ন, একদিন সেও হবে তার মামার মতো সিনেমার জনপ্রিয় পরিচালক। ওর সিনেমা দেখতে অসংখ্য মানুষ লাইন ধরবে হলের কাউন্টারে। ভিড় এড়াতে তাদের অনেকে যখন হাত বাড়াবে, খুশিতে সকল দন্ত বিকশিত করে হাসবে সব টিকেট ব্ল্যাকার।
আমাদের সহপাঠী শাফিউদ্দিন শাফি। আমাদের আরেক দোস্ত। বিখ্যাত চিত্রপরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ভাগ্নে। এই দুই মামা-ভাগ্নের দারূণ খাতির। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে শাফি এসে বসলো আমাদের পাশে।
আমি আর পার্কি বসে মহড়া দেখছিলাম। আর তালে তালে তালি দিয়ে ছন্দ তুলছিলাম। দারূন গাইছে ‘ধূপ-ধূনো’।
নারী ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দীলিপদারা এসেছেন। সাথে নিয়ে এসেছেন আগরতলার তুমুল জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ধূপ-ধূনো’কে। সন্ধ্যার আগেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছে গেছেন আগরতলার অতিথিরা। রাত দশটার দিকে শুরু করেছেন মহড়া।
‘ধূপ-ধূনো’ গাইছে তাদের বিপুল সাড়া জাগানো গান-

এলো কেশে যাচ্ছো কোথায়
পাহাড়িয়া কন্যা.
মুগ্ধ হয়ে দেখছি তোমার
এলো চুলের বন্যা..

-কইন্যাডা আইজগা আইলে আনন্দের বান বওয়াইয়া দিতাম.. আইতে ত পারল না.. উস্টা হাইয়া পরলো..
কখন যেনো আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন খালেক ভাই। দীলিপদা আর অরুণদাও আছেন তার সাথে।
-নাচের মাইয়্যাডি কই দীলিপদা! নাচটা একটু দ্যাখতাম.. খালেক ভাইয়ের আফসোস, হেরা কি আর দেবীর লাহান নাচতে পারব!
একপাশে টেনে নিয়ে খালেক ভাইকে বললাম, সিনামা যদি বানাইতেই চান, শাফির লগে কথা কন। ওই যে পোলাডা পার্কির লগে বইয়া রইছে..
হে কিতা করব?
শাফি কইলাম দেলোয়ার জাহান ঝন্টু সাবের আপন ভাইগনা। হে যদি ঝন্টু মামারে রাজি করাইতে পারে, সুপারহিট সিনামা হইব- কিশোর প্রেম।
-বইয়ের সবতা ত হারুন দ্যাখতাছে। আগে কইলিনা ক্যারে..
-কান্দিপাড়ার ওই বাটপারটারে বাদ দ্যান। মন্টু না ছন্টু কিয়ের পরিচালক, হেরেও বাদ দেন। দেখেন, শাফিরে দিয়া নি ঝন্টু মামারে রাজি করান যায়..
-না, না, হারুন পোলাডা অত খারাপ না। হে-অই থাক। অনেক ব্যাপার-স্যাপার আছে। তরা বুঝতি না।
চরম বিরক্তি লাগছে। খালেক ভাইকে সাহায্য করাও সম্ভব না। তিনি নিজের ইচ্ছায় চলেন। কি যেনো সব করেন। ঠিক বোঝা যায় না।
-আইচ্ছা, বাদ দেন। যারে ইচ্ছা, তারে দিয়া বানান। প্রবালরে কইতেন না?
-চাইছিলাম, আজগা রাইতে দেবী আর পরবালরে এক লগে লইয়া বমু। -চিন-পরিচয় করাইয়া দিয়া কমু, তুমরাই আমার কিশোর পেরেমের -নায়ক-নায়িকা। হেইডা ত আর অইল না..
একটু দূর থেকে ভেসে এলো দীলিপদার চিৎকার, কই রে কৈলাস, মীনাক্ষী-নীলাক্ষীদের ডাকতে বললাম না.. -দাদা ওদের নাচ দেখবেন..
দানবীর ভবনের পাশেই ছয় ফুট উঁচু আর দশ ফুট চওড়া একটা দেয়াল বানানো হয়েছে। এখন চলছে আবারো তা রঙ করার কাজ। দেয়ালের মাঝখানে বেশ বড় একটা জায়গায় ইট বেরিয়ে রয়েছে।
খালেক ভাইকে ডেকে দেখালো আজহার কন্ট্রাক্টর, এই হালি জায়গাডাত স্বেতপাথরের নামফলকটা বওয়ামু। রাইতেই বওয়ামু।
বলে চললো -আজহার, লাল মখমলের পর্দায় ডাহা থাকব সারাক্ষণ। পয়লা আপনেরা মাডিত কোপ দিয়া কামের উদ্বোধন করবেন। আর একদম শেষে দুই দিক থেইক্যা ফিতাত্ টান মারবেন। পর্দায় সইরা গিয়া নামডা ভাইস্যা উডব।
নামফলক দেয়ালের সামনেই কাঠের মঞ্চ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। মঞ্চ সজ্জার কাজ হবে কাল দুপুরে। অনুষ্ঠান শুরুর আগে।
খালেক ভাই দূরে এক কোনায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন কাশেম কেরানির সাথে। আধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তারা ফিসফিস করছেন। কি যেনো বলছেন।
পার্কিকে বললাম, -দোস্ত, কাশেম কেরানির লগে খালেক ভাইয়ের কিয়ের এতো দহরম-মহরম! কিতা হেরার গুপন কথা!
-ব্যাপারডা দুপুরেই আমার চোহে লাগছে। পার্কি বললো, -তুই হেয়াল করছিলি, কাশেম কেরানি আওনের আগেই আমরারে সরাইতে চাইতাছিল। আমরার লগে মন হারাপ। আবার কেরানিরে দেইখ্যা কিমুন হুশিতে ফাইট্টা পরল।
-হ, কাশেম কেরানির কালা ব্যাগডা দ্যাখছত্? খালেক ভাই খাবলা দিয়া লইয়া সিন্দুকে তালা দিল!
সন্দিগ্ধ আমরা দু’জনেই। কিছু একটা আছে। ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না।
-পরে ঘাটতে হইব দুস্ত.. অহন অনেক রাইত.. ল বাইত যাই। চিৎকার করে বললাম, খালেক ভাই, আমরা গেলাম..
আমার চিৎকার খালেক ভাইয়ের কানেই ঢুকলো না। আলো-আঁধারে দাঁড়িয়ে তিনি ডুবে আছেন কাশেম কেরানির সাথে গোপন শলা-পরামর্শে।
বেরিয়ে যেতে যেতে দেখলাম, মহড়ার মঞ্চে প্রস্তুত মীনাক্ষী-নীলাক্ষী ও তাদের সঙ্গীরা। অপেক্ষা করছে, কখন ওদের নাচ দেখবেন ভিপি আবদুল খালেক।
আমরা রিক্সায় উঠছি। তখন এলেন সোহেল ভাই। দানবীর ভবনের কেয়ারটেকার সোহেল মিয়াকে আমরা ভালোবেসে ডাকি সোহেল ভাই। খুব উৎকণ্ঠার সাথে বললেন, -আপনেরার লগে কথা আছে। খুব জরুরি।  এমনিতেই অনেক রাত হয়েছে। পার্কিকে কাজীপাড়ায় নামিয়ে আমি যাবো পাইকপাড়ায়। বাড়ি পৌঁছতে বেশ দেরি হয়ে যাবে।  বললাম, -কালকে হুনুম সোহেল ভাই। আইজগা বেশি রাইত অইয়া গেছে।  দারূণ সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে সোহেল ভাইকে। মনে হচ্ছে, কেনো যেনো প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছেন।
আমার হাত আঁকড়ে ধরলেন। থরথর করে কাঁপছে তার হাত। কি হয়েছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা।
সোহেল ভাই মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষ। বাড়ি-ঘর হারানো মানুষ। রণাঙ্গণ তাকে সাহসী করে তুলেছে। দানবীর সাহেব তাকে সাহসী করে তুলেছেন। তিনি এতোটা বছর পরম মমতায় একাকি আগলে রেখেছেন দানবীর ভবন। কখনো তো তাকে সন্ত্রস্ত দেখিনি!

উদ্বেগের সাথে জানতে চাইলাম, -কিতা অইছে সোহেল ভাই? আপনে কাপতাছেন ক্যারে? ডরাইতাছেন ক্যারে?
-আরে সোহেল ভাই, আপনে এইহানে কিতা করেন? অন্ধকার থেকে হাজির হলেন খালেক ভাই, যা.. যা.. তরা বাইত যা.. অনেক রাইত অইছে।
সোহেল ভাই কিতা জানি কইতে চাইতাছে..
-আইচ্ছা, আমি হুনুম নে.. ও সোহেল ভাই, লন.. আমার লগে লন.. তাড়া দিয়ে খালেক ভাই বললেন, অ রিসকাঅলা ভাই, হেরা ছুট্টু মানুষ.. ঠিক মতন বাইত পৌঁছাইয়া দিয়েন.. যা-ন, অহন যান..
আঁধার চিরে ছুটলো আমাদের রিক্সা।
পেছন ফিরে দেখলাম, কাঁধে রাখা হাতে টানতে টানতে সোহেল ভাইকে নিয়ে অন্ধকারে মিশে গেলেন ভিপি আবদুল খালেক।

চলবে…

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...