৭০ বছরে সংবাদ

0 8

কাশেম হুমায়ুন: আজ ১৭ মে। জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িক ও আদর্শবাদী সাংবাদিকতার মুখপত্র ‘দৈনিক সংবাদ’এর ৭০ বছরে পদার্পণ। ১৯৫১ সালের এ দিনে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার ব্যক্তিরা কাজ করেছেন। শুরু থেকেই সংবাদের আর্থিক অনটন ছিল। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক খায়রুল কবির তাঁর অনুজ আহমদুল কবিরকে সংবাদ পরিচালনার অনুরোধ করেন। আহমদুল কবির দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সংবাদ পুরোপুরিভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী একটি মুক্তচিন্তার দৈনিকে পরিণত হয়।

পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর রক্ষচক্ষুকে উপেক্ষা করে সংবাদের সাংবাদিকরা অত্যন্ত সাহসের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংবাদ ১৯৫৮ সালের আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী অবস্থান, ’৬২-এর ছাত্র আন্দোলন, ’৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ’৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং ’৬৮-৬৯-এর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থন দেয় এবং স্বৈরাচারবিরোধী জনমত গঠনে সক্রিয় সাহসী দায়িত্ব পালন করে।

ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের ওপর হামলা শুরু করে। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা নিরীহ বাঙালিদের হত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। তারা ২৫ মার্চ রাতে ‘সংবাদ’-এর ২৬৩, বংশাল রোডের অফিসটি জ্বালিয়ে দেয়। আগুনে পুড়ে মারা যান সংবাদ-এর একনিষ্ঠ সাংবাদিক ও কবি শহীদ সাবের। আহমদুল কবিরকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সংবাদ-এর অধিকাংশ সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বিজয়ের দু’দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর সংবাদ-এর বার্তা সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সারকে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে সংবাদ প্রকাশিত হয়নি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তানী কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে সংবাদ পুনরায় প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার পর দেশ গঠনে সংবাদ-এর সাংবাদিকরা আবারো দায়িত্ব পালন শুরু করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, এবং ৩ নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যার পর সামরিক স্বৈরাচার এবং স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। শুরু হয় পাকিস্তানী ধারার রাজনীতি। এসময় সংবাদ-এর কর্মীরা গর্জে ওঠে। সামরিক জান্তার সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সংবাদ-এর সকল কর্মী অর্পিত দায়িত্ব পালনে সোচ্চার হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে সংবাদ দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আজো দায়িত্ব পালন করছে।

শ্রদ্ধেয় আহমদুল কবিরের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী লায়লা রহমান কবির, জ্যেষ্ঠ পুত্র বর্তমান সংবাদ-সম্পাদক আলতামাশ কবির, তাঁর ছোটভাই আরদাশির কবির এবং ছোটবোন ব্যারিস্টার নিহাদ কবির সংবাদের অতীত ঐতিহ্য ও কমিটমেন্টকে অক্ষুণ্ণ রেখে সংবাদের প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁদের প্রতি রইল সংবাদ পরিবারের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

এই দীর্ঘ চলার পথে সংবাদ-এর অগণিত পাঠক, শুভানুধ্যায়ী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি রইলো শুভেচ্ছা। সংবাদের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে যারা পত্রিকাটির ইতিহাস সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে– গিয়াসউদ্দিন আহমদ, শহীদুল্লা কায়সার, খায়রুল কবির, আহমদুল কবির, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবদুল গণি হাজারী, সত্যেন সেন, বজলুর রহমান, সৈয়দ নুরুদ্দিন, নাসিরউদ্দিন আহমদ, সন্তোষ গুপ্ত, রণেশ দাশগুপ্ত, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবদুল আওয়াল খান, আবু জাফর শামসুদ্দিন, কে জি মুস্তাফা, তোয়াব খান, তোহা খান, এবিএম মূসা, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সৈয়দ শামসুল হক, মোজাম্মেল হোসেন মন্টু, নির্মলেন্দু গুণ, গোলাম সারওয়ার প্রমুখ অন্যতম। তাঁদের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

স্মরণ করছি তাদেরকে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে সংবাদকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এবং আমাদের নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সাহস যুগিয়েছেন।

[দ্রষ্টব্য : প্রতিবছর ১৭ মে সংবাদ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংবাদ কার্যালয়ে সংবাদ পরিবারের সদস্যদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবার করোনাভাইরাসের দুর্যোগের কারণে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে না।]

লেখক: কাশেম হুমায়ুন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
Loading...