৫৪-তে মুসলিম লীগের পতন বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে

স্বদেশ রায়: বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের একটি বড় দিক হলো ১৯৫৪ সালের পর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধিকার, স্বায়ত্তশাসন বা পরিপূর্ণ স্বাধীনতার বিপক্ষে বড় কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। আরও সহজ করে বলা যায়, ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনের পর এমন কোনো রাজনৈতিক শক্তি ছিল না যারা পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করতে পারে। ১৯৫৮-তে পাকিস্তানে পরিপূর্ণ সামরিক শাসন আসে আর সামরিক শাসকদের হাতেই পাকিস্তান এক অর্থে শেষ হয়ে যায়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের পশ্চিম খ-ে পাকিস্তান পিপলস পার্টি জয়লাভ করলেও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার দিক থেকে ওই পার্টির মুসলিম লীগের সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। তারা মূলত একই। এর বদলে দেখা যাচ্ছে ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে তৎকালীন পূর্ববাংলা পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর ওই অর্থে বড় ধরনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অন্যদিকে ৬০-এর দশকে এসে যে মূল রাজনৈতিক দলগুলো অর্থাৎ আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর), কমিউনিস্ট পার্টি অব পূর্ব পাকিস্তানÑ এরা সবাই নানাভাবে বাংলাদেশের সৃষ্টি বা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল। এর ভেতর আওয়ামী লীগ, ন্যাপ মোজাফ্ফর ও কমিউনিস্ট পার্টি মূলত বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দেওয়ার পর থেকে স্বাধীনতার জন্য এককভাবেই কাজ করে। আবার ১৯৫৪-এর নির্বাচনের জোটে কৃষক প্রজা পার্টি যুক্তফ্রন্টের বড় অংশীদার হলেও সেখানে মূল নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক পাকিস্তানে তখন আর খুব বেশি বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি লাহোর প্রস্তাবের মূল নেতা হওয়া সত্ত্বেও ১৯৪৭-এ যখন পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে, ততদিনে পাকিস্তান চিন্তা থেকে অনেকখানি সরে এসেছেন। সে বিষয়ে এখানে বিস্তারিত বলতে গেলে বিষয়ান্তরে চলে যেতে হবে। তবে তার সম্পর্কে এ কথা অবশ্যই বলতে হবে, যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে মুসলিম লীগকে পূর্ববাংলার রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করে বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনকে সহজ করে দেওয়ার পথে শেরেবাংলার ১৯৫৪ সালের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছাড়া হয়তো মুসলিম লীগকে এত সহজে নিশ্চিহ্ন করার কাজ সফল হতো না।

ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায়, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট যখন গঠিত হয়েছে, এর আগেই মুসলিম লীগ পূর্ববাংলায় তাদের মাটি হারিয়ে ফেলেছে। মুসলিম লীগ কোন কোন কারণে সেদিন এত দ্রুত পূর্ববাংলায় তাদের মাটি হারিয়ে ফেলেছিল, এ নিয়ে অল্পবিস্তর কিছু গবেষণা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে। তবে ওই সময়ের পত্রপত্রিকার, বিশেষ করে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩-এর পত্রপত্রিকার খবর ও ওইসব গবেষণা থেকে বেশ কতগুলো বিষয় নিশ্চিত হওয়া যায় কেন সেদিন মুসলিম লীগ এভাবে পূর্ববাংলার মাটিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। কারণ সত্যি অর্থে মুসলিম লীগ পূর্ববাংলার ভূমি দখল করেছিল ১৯৪৬-এর নির্বাচনে। ১৯৩৭-এর নির্বাচনে এ ভূমি ছিল শেরেবাংলার কৃষক প্রজা পার্টির। ওই নির্বাচনের পর কংগ্রেস প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল হয়েও দূরদৃষ্টি দেখাতে পারেনি। তারা পূর্ববাংলার মাটি ও মানুষের নেতা শেরেবাংলাকে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসেনি। আর এর ফলেই ফজলুল হকের তৎকালীন সরকার ভালো সরকার হতে পারেনি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তাকে নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তাই তিনি তার মানুষের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। আর এ সুযোগটিই নিয়েছিল মুসলিম লীগ পূর্ববাংলায় ১৯৪৬-এর নির্বাচনে। অনেকে অবশ্য ১৯৪৬-এর নির্বাচনকে ঢালাওভাবে পাকিস্তানের সমর্থনের নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করেন বা সেভাবে অনেকখানি এ যাবৎকালের ইতিহাসেও এসেছে। কিন্তু এখন মনে হয়, ইতিহাসকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখার সময় এসে গেছে। কেননা ভারতবর্ষের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মুসলিমকে রেখে ভারতের কোনো একটি বা দুটি অংশের মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র বাস্তবে সেদিন সচেতন মুসলমানদের বড় অংশ পছন্দ করেনি। কারণ তারা জানতেন, এর ফলে মুসলিমদের বড় অংশ একটি হিন্দু রাষ্ট্রে ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু হবে। তা ছাড়া ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামটি একক ভারতকেন্দ্রিক ছিল। ওই আন্দোলনে সচেতন মুসলিম সমাজের অংশগ্রহণও কম ছিল না। এ কারণেই ১৯৪৬-এর নির্বাচনে বর্তমানের পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেই মুসলিম লীগ জয়লাভ করেনি। এর বদলে শুধু পূর্ববাংলায় কেন মুসলিম লীগ জয়লাভ করল, এর কারণগুলো ভবিষ্যতের গবেষণার ভেতর দিয়ে আরও ভালোভাবে বের হয়ে আসবে। তবে মোটা দাগে কয়েকটি বিষয় বলা যায়Ñ এক. ওই নির্বাচনের আগে পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের সব থেকে প্রিয় নেতা, বিশেষ করে দরিদ্রের নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের অবস্থান কিছুটা বদলে বা দুর্বল হয়ে যাওয়া। দুই. পূর্ববাংলার তৎকালীন প্রায় তিন হাজারের মতো হিন্দু জমিদার ও তাদের জোতদারদের প্রতি সাধারণ মানুষ বিরক্ত ছিল। তিন. মুসলিম লীগের ছাত্রকর্মীরা নির্বাচনটিকে সাধারণ দরিদ্র মুসলিমের মুক্তির নির্বাচন হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এমনই আরও বেশকিছু কারণে ১৯৪৬-এর নির্বাচনে পুরো ভারতবর্ষের মধ্যে একমাত্র পূর্ববাংলাতেই মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তা মুসলিম লীগকে পাকিস্তান সৃষ্টিতে অনেকখানি সাহায্য করে। তবে অন্দর মহলের একটি রাজনীতি পাকিস্তান সৃষ্টিতে বেশি সাহায্য করেছিল। ওই অন্দর মহলের রাজনীতি বিস্তারিত ব্যাখ্যা না করে খুব সংক্ষেপে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতি এবং কংগ্রেসের কিছু নেতা ওই বিশ্ব রাজনীতির চক্রে পা দেওয়ায় পাকিস্তান সৃষ্টি, বিশেষ করে ভারত ভাগ আরও বাস্তবে চলে আসে। ফলে শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগের হাত দিয়েই পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। এ কারণে ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট যখন মুসলিম লীগ পাকিস্তান হাতে নিয়ে পূর্ববাংলায় আসে বা পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি পতাকা ওড়ে, ওই সময়ে পাকিস্তানে মুসলিম লীগ অনেকখানি জাতীয় প্ল্যাটফরমের রূপ নেয়। আর এখানেই বড় প্রশ্ন, ১৯৪৭-এ একটি দল জাতীয় প্ল্যাটফরমে রূপ নিয়ে মাত্র ৭ বছরের ভেতর কেন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল?

মুসলিম লীগ সব থেকে বড় ভুল করেছিল বাংলা ভাষার প্রশ্নে সঠিক অবস্থা

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry