alo
ঢাকা, বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৮, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অস্থিতিশীল বিশ্বে ঝুঁকি বাড়ছে সাংবাদিকতায়

প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারী, ২০২৩, ০১:০৬ পিএম

অস্থিতিশীল বিশ্বে ঝুঁকি বাড়ছে সাংবাদিকতায়
alo


অলোক আচার্য: সময়ের সাথে সাথে বিশ্ব যুদ্ধ, সংঘাত, পারস্পরিক অনাস্থা ইত্যাদি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে সাংবাদিকতায় ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেখানে বর্তমান বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধাক্রান্ত দেশগুলো থেকে মুহূর্তেই সংবাদ পৌঁছে যাচ্ছে অন্য প্রান্তে। অথচ সাংবাদিকরাই নিজেদের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে এসব সংবাদ সংগ্রহ করছে।

এটা শুধু একটি দেশের নয় বরং বিশ্বজুড়েই সাংবাদিকরা এই চ্যালেঞ্জের মধ্যে কাজ করেন। গণতন্ত্রের গতিশীলতায় স্বাধীন গণমাধ্যম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের সামনে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করে গণমাধ্যম কর্মীরা বা সাংবাদিকরা সমাজকে সত্য দর্শন করাচ্ছে। এখানে ঝুঁকি আছে। সেই ঝুঁকি থাকার কথা জেনেও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পত্রিকা, টিভি চ্যানেলের সাথে সাংবাদিকতা পেশায় আসছে নতুন মুখ। নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এরা মাঠে নামছে। তাদেরও পরিবার পরিজন আছে। তবুও ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না। 

বিশ্বজুড়েই সাংবাদিক নিহতের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধ-সংঘাত অঞ্চলে এসব আরও বেশি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। সম্প্রতি প্যারিস ভিত্তিক সংস্থা রিপোর্টাস উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) তাদের বিশ্লেষণমূলক এক প্রতিবেদনে জানায়, বিশ্বজুড়ে ২০ বছরে প্রায় ১৭০০ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিবছর ৮০ জনের বেশি সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। আরএসএফ জানায়, ২০০৩ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকরা ভয়াবহ দুটি দশকের মধ্য দিয়ে গেছেন। এ সময় সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ ছিল ইরাক ও সিরিয়া। এর মধ্যে মেক্সিকো,ফিলিপাইন,পাকিস্তান,আফগানিস্তান এবং সোমালিয়ায় বেশি সংখ্যক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এছাড়াও চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও সাংবাদিক নিহতের ঘটনা ঘটছে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ৪র্থ স্তম্ভ বলা হয়। সে হিসেবে এই স্তম্ভটি হওয়া উচিত অত্যন্ত শক্তিশালী। কোন দেশের উন্নয়নে মুক্ত গণমাধ্যম অন্যতম শর্ত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া উচিত। কারণ গণমাধ্যম রাষ্ট্রের পরিচালিত ব্যবস্থার খুঁটিনাটি দিকগুলো চিহ্নিত করে এবং তা বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথ বাতলে দেয়। গণমাধ্যমের প্রকার এখন বিস্তৃত।  টেলিভিশন চ্যানেল, প্রিন্ট পত্রিকা এবং রেডিওর সাথে সাথে অনলাইন পত্রিকা,অনলাইন টিভি এবং অনলাইন রেডিও রয়েছে প্রচুর। 

প্রতিদিন নতুন নতুন পত্রিকা বের হচ্ছে। জানার ইচ্ছা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এই সহজাত প্রবৃত্তি পূরণের জন্যই গণমাধ্যমগুলো কাজ করে। এর সাথে যুক্ত কর্মীরা প্রতিনিয়ত মানুষের তথ্য জানার আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে তা সংগ্রহ এবং প্রচার করছে। এই তথ্য জানানোর কাজটি সবক্ষেত্রে সহজ হয় না। অনেক সময় ক্ষমতাশালীর রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করেই তাকে তার কাজ করতে হয়। হরহামেশাই সাংবাদিককে তথ্য সংগ্রহের সময় হয়রানির শিকার হতে হয়। এতকিছুর পরেও সে সেসব বাধা উপেক্ষা করেই তার কাজ চালিয়ে যায়। প্রতিটি মুহূর্তে একজন গণমাধ্যম কর্মীর ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে যেতে হয়। আর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর নতুন পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০২২ সালে সাংবাদিক ও অন্যান্য গণমাধ্যম কর্মী হত্যা ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি চার দিনে একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এই তথ্যে দেখা গেছে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী মোট ৮৬ জন সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম কর্মী নিহত হয়েছেন, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গড়ে সাংবাদিক নিহতের সংখ্যা ছিল ৫৮। এর মধ্যে কেবল লাতিন আমেরিকায় ৪৪ জন সাংবাদিক নিহত হন। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১৬ জন এবং পূর্ব ইউরোপে নিহত হয়েছেন১১ সাংবাদিক।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল কথা হলো রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। তাই তথ্য জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। আর তথ্য জানানোর দায়িত্বও রয়েছে। সেজন্য গণমাধ্যমকে সমাজের আয়না হিসেবে পরিগণিত করা হয়। আয়নায় যেরূপ নিজের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গণমাধ্যমেও সমাজের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই ছবি ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব নেন গণমাধ্যম কর্মী। দেশে এখন শত শত পত্রিকা। জাতীয়,স্থানীয়,সাপ্তাহিক মাসিক পাক্ষিকসহ বিভিন্ন পত্রিকা টেলিভিশন এবং অনলাইনে কাজ করা সারাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে লাখ লাখ সাংবাদিক। পত্রিকায় কাজ করা প্রান্তিক পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিশ্রম করতে হয় ঠিকই কিন্তু তাদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেয়া হয় না। পত্রিকা প্রকাশের বিজ্ঞাপন দিলেই প্রচুর সংখ্যক আবেদন পাওয়া যায় সাংবাদিকতা করার জন্য। তারা এটা জানে যে এখান থেকে কোন আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে না। সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত থাকা সম্মানের জন্যই মূলত এত আগ্রহ দেখা যায়। সংবাদ সংগ্রহের বিপরীতে তাদের আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব দেশ এবং বিদেশের সংবাদ প্রকাশ এবং বিশ্লেষণ করে জনগণকে সচেতন করে। এছাড়া বিনোদন এবং শিক্ষামূলক কাজেও গণমাধ্যম যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে প্রতিনিয়তই। গণমাধ্যমে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। গণমাধ্যম তখনই সার্থকতা পায় যখন জনগণের উপকারে এসে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। এজন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুক্ত প্রকাশ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। সারা বিশ্বেই গণমাধ্যম কর্মীদের নানাভাবে নির্যাতিত হতে হয়। জেল জরিমানা হুমকি ধমকি এসব সহ্য করতে হয়। তারপরেও গণমাধ্যমকমীদের সংবাদ সংগ্রহ থেমে থাকে না। 

সাংবাদিকরা জনগণের ভেতরের শব্দ ফুটিয়ে তোলেন। সেক্ষেত্রে বলা যায়, সাংবাদিকতা একটি ক্ষমতা। সত্য তুলে আনার ক্ষমতা। তবে এই ক্ষমতা মানুষের জন্য, কোন ব্যক্তি বিশেষকে সন্তুষ্টি করার জন্য নয়। নারীদের একটি বড় অংশ এখন গণমাধ্যমে কাজ করছে। দিনদিন এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে। কাজের ক্ষেত্রে একটি সমতা গণমাধ্যম করে যাচ্ছে। জনগণের আস্থা অর্জন মূখ্য বিষয়। কতটি গণমাধ্যম আজ মফস্বল এলাকায় নিয়োজিত কর্মীদের জন্য বেতন ভাতা নিশ্চিত করে নিজেদের জন্য একটি দক্ষ জনবল তৈরি করতে পেরেছে। বিষয়টি প্রশ্ন সাপেক্ষ। কারণ আজকাল নিয়োগ দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে অনেকে। সেই কর্মীর প্রতি এর বাইরে আর কিছু করার প্রয়োজন পরে না। বেতন-ভাতা তো পরের কথা নূন্যতম পকেট খরচও অনেক গণমাধ্যম-কর্মীর কপালে জোটে না। এই ব্যর্থতার কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এই ব্যর্থতা ঢাকতে অন্য কাউকে নয় গণমাধ্যমকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বিশ্ব যত অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে ততই সাংবাদিকদের জন্য কাজের পরিবেশ প্রতিকূলে চলে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হবে। সেদিক থেকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
 

X