alo
ঢাকা, শুক্রবার, অক্টোবর ৭, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২১ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
শুভ জন্মদিন

প্রাণময় তরুণ শেখ কামাল

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট, ২০২২, ০৯:০২ এএম

প্রাণময় তরুণ শেখ কামাল
alo


এম নজরুল ইসলাম: অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী ছিলেন তিনি। যেকোনো মানুষকে অনায়াসে কাছে টানার শক্তি রাখতেন। জানতেন কী করে সংগঠনকে প্রাণবন্ত রাখতে হয়।

‘শেখ মুজিব : তাঁকে যেমন দেখেছি’ গ্রন্থে আবুল ফজল তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আমার হাতব্যাগটি এবারও নিজের হাতে তুলে নিয়ে নিচে নেমে এসে গাড়ির দরজা খুলে আমাকে বসাল।

এবারও নিজে ড্রাইভারের সিটে বসে স্টার্ট দিয়ে দিল। দেখলাম ও সব সময় একা। এয়ারপোর্টে পৌঁছে বোর্ডিং কার্ড করার জন্য নিজেই ব্যাগটি হাতে নিয়ে কিউর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। রাষ্ট্রপ্রধানের ছেলে বলে কোনো রকম অগ্রাধিকার খাটাতে চাইল না। দেখে আমার খুব ভালো লাগল। যখন ওর পালা এলো তখনই শুধু টিকিটটি বাড়িয়ে দিল। বোর্ডিং কার্ডটার্ড হয়ে যাওয়ার পর বিমান ছাড়া পর্যন্ত ও থেকে যেতে চাইছিল। আমি অনেক বলে-কয়ে ওকে লাউঞ্জ থেকে বিদায় দিলাম। একই দিন ওর গাড়িতে ও আমাকে চারবার লিফট দিয়েছে, কিন্তু নিজে চারবারও বোধকরি কথা বলেনি। ’

সদ্যঃপ্রয়াত সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর সম্পর্কে কালের কণ্ঠেই লিখেছেন, ‘আমি অনেক সময় বিস্মিত হয়ে ভাবি, আজ বেঁচে থাকলে শেখ কামাল কী হতেন? একজন রাজনীতিবিদ, একজন ব্যবসায়ী, না একজন সেনানায়ক? যেকোনো একটি হওয়ার যোগ্যতা তাঁর ছিল। ...আমার ধারণা, শেখ কামাল বেঁচে থাকলে রাজনীতিবিদ হতেন। রাজনীতিতে তাঁর ঝোঁক ছিল। ...শেখ কামালের রাজনৈতিক বোধের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনা দৃঢ় ভিত্তি লাভ করতে চলেছিল। তাঁর সঙ্গে কয়েকবার ব্যক্তিগত আলাপেও এটা আমি লক্ষ করেছি। ’

প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠে লিখেছেন, ‘বলতে গেলে তার সব কাজেই উৎসাহ ছিল। সে রাজনীতি করত কি না জানি না। খেলাধুলা করত শুনেছি, আমি সেটা চোখে দেখিনি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যে পদচারণ ছিল, সেটা আমি বেশ কাছ থেকেই দেখেছি। আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। শেখ কামালের সঙ্গে আমার কলকাতা সফর এবং হারমোনিয়াম কিনে দেওয়ার যে গল্প তা এখনো স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। ’

এই হচ্ছেন শেখ কামাল। দীর্ঘ দেহ, ঋজু। পুরু গোঁফ। চোখে কালো ফ্রেমের মোটা কাচের চশমা। পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। ঠোঁটে প্রশ্রয়ের স্মিত হাসি। এ এক উচ্ছল তরুণের প্রফাইল।

সেই প্রাণময় তরুণকে আজ আর কোথাও দেখি না। সদ্যঃস্বাধীন দেশে তখন আমরা ডানা মেলে উড়ছি যেন। চারদিকে আনন্দের জোয়ার। সেই জোয়ারে তিনি দক্ষ এক সংগঠকের ভূমিকায়। গানের আসরে তাঁকে পাই। নাটকের মঞ্চে তাঁর সপ্রাণ উপস্থিতি। খেলার মাঠে তো আছেনই তিনি। রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়েও তিনি উপস্থিত।   হাসিমুখে টেনে নিচ্ছেন কাছে। তিনি আমাদের কামাল ভাই।   

শেখ কামালের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী আজ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্য রকম একটা জোয়ার আনার চেষ্টা করেছিলেন শেখ কামাল। বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতির গুণগত মানের পরিবর্তনের চেষ্টা ছিল তাঁর। সরকারের প্রধান নির্বাহী ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির ছেলে হয়েও দলের উঁচু পদের দিকে তাঁর কোনো মোহ ছিল না। সাধারণ কর্মী হিসেবেই কাজ করতেন তিনি। ছিলেন উদ্যমী পুরুষ। সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে খেলার মাঠ, সর্বত্র ছিল তাঁর পদচারণ।

এই প্রাণবন্ত তরুণ প্রতিভাকে যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়নি। মূল্যায়ন দূরের কথা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ তাঁর শিল্পীমনের পরিচয় কজনের জানা আছে? অনেকেই হয়তো জানেন না শেখ কামাল চমৎকার সেতার বাজাতেন। ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে দেশের সংগীতজগতে পপসংগীতের যে উত্থান, তার নেপথ্যেও শেখ কামালের অবদান কম নয়। বন্ধু শিল্পীদের নিয়ে সে সময় গড়ে তুলেছিলেন ‘স্পন্দন’ শিল্পীগোষ্ঠী—যে দলটি দেশের সংগীতজগতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিল, সেই সাতের দশকের প্রথমার্ধে। দেশের নাট্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে শেখ কামাল ছিলেন প্রথম সারির সংগঠক। ছিলেন নাটকের দল নাট্যচক্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও। অভিনেতা হিসেবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় উৎসাহী শেখ কামাল স্বাধীনতার পর আবির্ভূত হন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। তিনি উপমহাদেশের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠন ও আধুনিক ফুটবলের অগ্রদূত আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা। রাজনীতিতেও তাঁর অবদান কম নয়। ছাত্রলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী তিনি। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন এবং শাহাদাতবরণের সময় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কমিশন লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আজকের দিনে যখন নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে সাম্প্রদায়িক শক্তি, যখন স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করেই চলেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল—তখন শেখ কামালের মতো একজন দক্ষ সংগঠকের অভাব বোধ করি। আজ তাঁর মতো নেতৃত্ব বড় প্রয়োজন এই দেশে। তাঁর আদর্শ অনুসরণের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। রাজনীতি যখন কারো কারো কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি, তখন শেখ কামালের দেখানো পথ ধরে রাজনীতিকে সত্যিকারের মানবকল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব। সব সম্ভবের দেশেও কেমন করে নির্মোহ থাকা যায়, শেখ কামাল তারই অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

আজ জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই প্রাণময় তরুণকে, যাঁর প্রেরণা একদিন আমাদের উজ্জীবিত করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিতে। তিনি আমাদের দীক্ষা দিয়েছিলেন দেশপ্রেমের মন্ত্রে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী।

X