সরকারকেই সব দিক সামলাতে হবে

আহসান উদ দৌলা মারুফ:

করোনাভাইরাস মহামারীতে বিশ্বজুড়ে চলছে চরম আতঙ্ক। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমেছে মন্দাভাব। স্বভাবতই এর প্রভাব পড়েছে গোটা পৃথিবীর মানুষের আয় আর রুটি-রুজির ওপর। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এর আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। আর সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে দেশের হতদরিদ্র থেকে শুরু করে সরকারি চাকরি না করা মধ্যবিত্ত মানুষ।

সঙ্কট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এরইমধ্যে হাতে নিয়েছে নানা উদ্যোগ। তৈরি পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য শিল্প-প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য ঘোষণা করেছে কোটি কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ। যার প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি শ্রমিক-কর্মচারিদের জীবিকার চাকা সচল রাখা।

একটি দেশের সরকার কেবল সে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান তথা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় কর্মরত সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিও সমান দায়বদ্ধতা রয়েছে সরকারের। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাই বলেছেন, কেউ যাতে চাকরি না হারায় অর্থাৎ সবাই যাতে বেঁচে থাকতে পারে সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে তাঁর সরকার।

তবে প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পরও নিয়মিত বেতন না দেয়ার পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় শ্রমিক-কর্মচারি ছাঁটাই কিন্তু থেমে নেই। কোথাও কোথাও অবশ্য করোনা মহামারী শুরুর অনেক আগে থেকেই এমন পরিস্থিতি চলছে। আর করোনার সাধারণ ছুটিতে ঈদ বোনাসতো দূরের কথা অনেক অফিসে অর্ধেক বেতনও দেয়া হয়েছে। কিন্তু দেখার যেন কেউই নেই। বিচারের বাণী কেবল নীরবে নিভৃতেই কেঁদে যায়। তবে এমন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো এর আগে মাসে কোটি কোটি টাকাও আয় বা লাভ করেছে।

এ দেশে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না বলা পর্যন্ত কোন কাজই হয় না। সব নির্দেশ যেন তাঁকেই দিতে হয়। যদি তাই হবে তবে মন্ত্রী-সচিবসহ উর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের কাজটা আসলে কি? আর কাজ না থাকলে তাদের অস্তিত্বের মূল্য নিয়ে প্রশ্নটাও কিন্তু চলেই আসে। কারণ প্রধানমন্ত্রীতো আর সবখানে ঘুরে ঘুরে সবটা খুঁজে খুঁজে দেখবেন না। এখন পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা সে তথ্য কি দিতে পারবেন কোন কর্তাব্যক্তি?

এদিকে, চলতি জুন মাস থেকে তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই শুরুর কথা বলা হচ্ছে। শতভাগ কাজ নেই, তাই শতভাগ শ্রমিকের প্রয়োজন নেই- এমন কথা বলছে মালিক পক্ষ। কি দারুণ আর চমৎকার স্বীকারোক্তি!!! সরকারি প্রণোদনার টাকা দিয়ে দুই মাসের বেতন (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা শতভাগ নয়) দেয়ার পর এখন মালিক পক্ষের এমন কথা সত্যিই চরম হতাশার।

এতোদিন যে শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করেছেন সাময়িক এই দুঃসময়ে তাদের এভাবে পথে বসিয়ে দেয়া কতোটা মানবিক সে হিসেবটাও রাখা দরকার। আর কয়েক মাস পর সব কিছুই ঠিক হয়ে আসবে, যা এরইমধ্যে শুরু হয়েছে। তাই এই দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকা মালিক পক্ষের দায়িত্ব। টাকাতো আর কম নেই। চালিয়ে নিন না আর কয়েকটা মাস। নাকি শুধু সরকারি প্রণোদনার অর্থ দিয়েই চালাবেন? শ্রমিকদের প্রতি কি কোন দায়ই নেই আপনাদের? নাকি এতোদিনের লাভের জমানো টাকায় হাত দেয়া বারণ?

মালিক পক্ষ এতোটা বিবেকহীন হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার পুরো বিষয়টি আমলে নেবেন, এমনটাই প্রত্যাশা সবার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি প্রণোদনা দেবেন, কম সুদে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দেবেন, আবার শ্রমিক ছাঁটাইও মেনে নেবেন? নিশ্চয়ই তা নেবেন না। আর ভুলে গেলেও চলবে না এর দায়টা কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনার ওপরই বর্তাবে। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভালোমন্দ সব কিছু দেখার দায়িত্ব সরকারের প্রধান নির্বাহীর। তার ওপর আপনি যখন দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর কন্যা।

দেশের অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে ঠিক আছে। কিন্তু শ্রমিক-কর্মচারী তথা জনগণের কি প্রয়োজন নেই? ব্যবসায়ীরা কি কল-কারখানা চালাবেন? তারা যেমন কল-কারখানায় কাজ করবেন না, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে ব্যবসায়ীদের ভোটও কিস্তু যথেষ্ঠ নয়। ব্যবসায়ীরা কেবল দলীয় টিকিটে নির্বাচনই করতে পারবেন। শুধু ব্যবসায়ীদের দিয়ে দেশ বা সরকার কোনটাই চলবে না। তাই সরকারি প্রণোদনার সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি যাতে এর সুফল তারাও পায়।

সবচেয়ে শঙ্কার ব্যাপারটি হচ্ছে- সত্যিই যদি দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে পড়ে তবে সমাজের জন্য তা এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। অপরাধমূলক কর্মকান্ড ছাড়াও নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়বে এরা। কারণ বেঁচে থাকার জন্য আর কোন উপায় খোলা থাকবে না তাদের সামনে। তাই পরিস্থিতিটা যাতে একেবারেই নাগালের বাইরে চলে না যায় সে জন্য সীমিত সাধ্যের মধ্যেই যতোটুকু সম্ভব সরকারকে সব দিক সামলাতে হবে। আর বর্তমান সরকার সেটা চাইলে পারবেন, সবাই সেটাই বিশ্বাস করতে চায়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...