মিডিয়া ট্রায়াল, গণমাধ্যম এবং একজন ডাক্তার

সৌরিন দত্ত:

গণতন্ত্রে গণমাধ্যমকে ফোর্থ স্টেট বা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হত। কারণ, রাষ্ট্রের প্রভাবগত অবস্থানে তার স্থান ছিল চার নম্বরে। কিন্তু হাল আমলে গণমাধ্যমের কাজকর্ম দেখে মনে হয় গণমাধ্যম বুঝি এখন এক নম্বর আর রাষ্ট্রের অন্যান্য স্তম্ভগুলো তার পরে। আজকাল গণমাধ্যম বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করে, আইন বিভাগকে হুমকিতে রাখে আর প্রশাসনের কাজে নাক গলায়। অথচ একটি রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের ভুমিকা হওয়া উচিত ‘ওয়াচডগ’- এর, ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ এর নয়।

পাঠকের অবগতির জন্য জানাই ভারতের রাজধানী দিল্লীর বিখ্যাত খুরশীদ আনোয়ার আত্মহত্যা কেসটির কথা। ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল ডেমোক্রেসি নামে এক এনজিওর নির্বাহী পরিচালক ৫৫ বছর বয়সী খুরশীদ আনোয়ার ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। তার প্রতিষ্ঠানের এক জুনিয়ার সহকর্মী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। ঐ সহকর্মী জানিয়েছিলেন, তাকে এবং এনজিওর অন্য সদস্যদের নিজের বাড়িতে নৈশভোজে ডেকেছিলেন খুরশীদ। সেখানে তাকে কোল্ড ড্রিঙ্কস দেওয়া হয়। তার পরই তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। এরপরই খুরশীদ তাকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ করেন ওই নারী। পাশাপাশি তিনি এও জানিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে তিনি এনজিওর সিনিয়ার সদস্যদের জানালেও কেউই তাকে সাহায্য করেনি। এ বিষয়ে ওই কর্মী কোন এফআইআর ও দায়ের করেননি। কিন্তু কিছুদিন পর আরেক এনজিও নেত্রী ওই অভিযোগকারিনীর একটি ভিডিও ধারণ করে তা সামজিক মাধ্যমে প্রচার করেন। কয়েকদিনেই বেশ ভাইরাল হয় তা। এরপর একে অভিযোগকারী নারী, তদুপরি বড়লোকি পার্টিতে মদ্যপান এবং তার পর কী কী হয় তা নিয়ে রগরগে মনগড়া বর্ণনা। ব্যাস! হু হু করে বাড়তে থাকে টিভি নিউজ চ্যানেলগুলোর টিআরপি। রজত কাপুর নামে এক টেলিভিশন নিউজ হোস্ট তার অনুষ্ঠানে খুরশীদ আনোয়ার সাহেবের চরিত্র হনন করতে করতে এক পর্যায়ে বলেন ‘আমরা ধর্ষণকারীকে ছাড়বো না’। রজত কাপুর সাহেব হয়ত জানতেননা যে বিষয়ে কোন মামলা দায়ের হয়নি, শুধুমাত্র অভিযোগ শুনেই তাকে দোষী বলা যায় না। অথবা জেনেশুনেই হয়ত তিনি এ কাজ করেছেন।

কিন্ত টিআরপি বাড়ানোর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় তিনি যে কত বড় অপরাধ করেছেন সে বিচার আজও হয়নি। প্রতিটি মানুষের রয়েছে ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার। কিন্তু সে বিচারের আগেই মিডিয়া নিজেরাই খুরশীদ সাহেবকে দোষী বানিয়ে ফেলে। সামাজিক এ অপমান সইতে না পেরে নিজ বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। কোন কাজ, প্রচার বা প্রকাশনা যা আদালতের ন্যায় বিচারের বাঁধা সৃষ্টি করে তাই আদালত অবমাননা। আর জীবন দিয়ে সে অবমাননার দাম দিয়ে গেছেন খুরশীদ আনোয়ার সাহেব।

ভারতের এই ঘটনার সাথে আমরা মিল খুঁজে পাই প্রায় সে সময়ের বাংলাদেশের একটি ঘটনায়। ঐশী নামে একটি মেয়ে তার বাবা-মাকে হত্যা করেছিল। মামলাটির রায়ে ঐশীর ফাঁসি হয়। বাংলাদেশে বসে বাংলাদেশের আদালতের দেওয়া একটি মামলার রায় নিয়ে মন্তব্য মোটেও বুদ্ধির কাজ হবেনা। তবে শুধু এতটুকু বলতে পারি সে মামলার অভিযোগ গঠনের আগেই বাংলাদেশের মিডিয়া এক বালিকার জীবনের নানান সত্য-মিথ্যা কাহিনী নিয়ে মোটামুটি বিচার সেরে ফেলেছিল। রায়ে ঐশীর ফাঁসি হলেও তার মাদকাসক্তিজনিত মানসিক অসুস্থতা এবং বয়স একটি প্রামান্য বিষয় ছিল এবং রায় পরবর্তী টক শোতে এক আইনজীবী মিডিয়া ট্রায়ালের বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।

বাংলাদেশে এখন মিডিয়ার হট কেক ডাক্তার সাবরিনা। একে সুন্দরী, সাথে আর্থিক কেলেংকারী এবং তদুপরি বিগত জীবনের ভাগ্যবিরূপতা এই নারীকে মিডিয়ার কাছে টিআরপি বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ বিষয় করে তুলেছে। অশিক্ষিতের এ দেশে নারী হিসাবে জন্মানোটাই যেখানে অপরাধ, সেখানে সুন্দরী নারী হওয়া যে আরও বড় অপরাধ তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। তিনি যদি দোষী হয়ে থাকেন তবে রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। কিন্তু সে বিচারের আগেই তার ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশ্যে আনা, তার অনুমতি ব্যাতিরেকে ছবি ছাপানো কতটা সুস্থ মানসিকতা, শালীনতা বা পেশাদারিত্বের পরিচায়ক তা হয়ত তর্ক সাপেক্ষ কিন্তু বিচারের আগেই তাকে প্রতারক বলা অবশ্যই আদালত অবমাননা। এটি আইনের মূলকথা ‘অপরাধ প্রমাণের আগে প্রতিটি মানুষ নির্দোষ’ এ নীতির পরিপন্থি। এ ধরনের সাংবাদিকতা একজন মানুষের ন্যায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক এবং নিরপেক্ষ বিচারের অন্তরায়। অবশ্যই সে সব সাংবাদিকদের জানা আছে যে এ ধরনের সংবাদ আদালত অবমাননা এবং অভিযুক্ত ও তার পরিজনদের ব্যাক্তিজীবনকে বিষাদময় করে তোলার জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এদেশের গণমাধ্যম বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য মামলার নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। আশির দশকে তৎকালীন সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী ভুমিকায় ‘সালেহা হত্যা মামলা’ নামে এদেশের এক মাইলফলক মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল যেখানে আদালতের নির্দেশে প্রথমবার ময়নাতদন্ত শেষে কবর থেকে লাশ তুলে দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত হয়েছিল এবং অভিযুক্ত সর্বোচ্চ শাস্তি পেয়েছিল। তবে সেসব ছিল সুন্দর সাংবাদিকতার দিনের কথা। মিডিয়া তখন সত্যিকারের ওয়াচ ডগের ভূমিকা পালন করেছিল।

কিন্তু পরবর্তীতে ক্রমশ বেড়েছে মিডিয়ার বিতর্কিত ভূমিকা। এদেশের ইতিহাসের আরেক ঘৃন্য মামলা শারমীন-রীমা হত্যা মামলা। মামলার বাদি-আসামি-বিচারক-পুলিশ সবাই একটি বিষয়ে একমত যে এ মামলার রীমার হত্যার সময় আসামি মুনির ছাড়া ঘটনাস্থলে আর কেউ উপস্থিত ছিলনা। কিন্ত সেসময় অধুনালুপ্ত বাংলার বানী নামে একটি পত্রিকা লিখেছিল, ‘মৃত্যুর আগে রীমার করুণ আকুতি আমাকে মের না’। যেন ঐ প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এদেশের দুই প্রথিতযশা সংস্কৃতি কর্মীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুতে আদালত আসামি গাড়িচালককে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছিলেন যা নজিরবিহীন। দেশের ঐ দুই সূর্ যসন্তানের মৃত্যু এ দেশের জন্য অপূরণিয় ক্ষতি কিন্তু ঐ গাড়িচালকের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল মূলত ৪২৭ ধারায় যা কিনা মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত করার ধারা। এবং মামলার সাথে সম্পর্কিত সবাই একথা স্বীকার করেন ঐ বিশেষ গাড়িটিকে ধাক্কা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোন বিশেষ মোটিভ ঐ বেপরোয়া গাড়ি চালকের ছিলনা। এ ক্ষেত্রেও মিডিয়া ট্রায়ালের বিষয় থাকতে পারে।

অপরাধীর সাজা হোক কিন্তু বিচারের আগে কাউকে দয়া করে অপরাধী বানাবেন না। অন্য কারও সিম ব্যবহার করা অপরাধ কিন্তু সে সিম দিয়ে প্রতারণা হয়েছে না অন্য কিছু তা প্রমাণ সাপেক্ষ। আগেই আমরা যেন কাউকে অপরাধী না বানাই, ওটা মিডিয়ার কাজ নয়, আদালতের কাজ। আসুন, যার কাজ তাকে করতে দেই। মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন Injustice anywhere is a threat to justice everywhere।

লেখক: হেড অব ইন্টারন্যাশনাল সাপ্লাই চেইন, ডিএইচএল গ্লোবাল ফরোয়ার্ডিং

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...