ভাল থাকুক প্রিয়জন

মোঃ জিয়াউল হক রাসেল:

মানুষ কি মানবিক হবে না? দুনিয়াজুড়ে কিছু মানুষ এই মহাদুর্যোগেও স্বার্থপরতায় মত্ত থাকবে! করোনার ভয়াবহতা কি তারা দেখছে না! তবুও মানুষের হিংসা, লোভ কোন কিছুই থামছে না। সবাই বলছেন ‘করোনা ভাইরাসের সময় সবার সঙ্গে মানবিক আচরণের মাধ্যমে সম্প্রীতি বজায় রাখুন। উপদেশ হিসেবে এটা মূল্যবান। তার পরও পরিবারের সদস্যের লাশ ফেলে পালাচ্ছে ‘প্রিয়জন’।

মেহেরপুরের পুষ্প রানী সাহা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় মেয়ের বাড়িতে ছিলেন। সেখানে করোনায় আক্রান্ত হলে একটি ভাড়া করা গাড়ীতে করে নিজ বাড়িতে ফেরেন। তবে তাকে বাড়িতে ঢুকতে না দিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছেলে।

মৃত্যুর পর নরসিংদীর ফেরদৌসি বেগমের লাশ গ্রহণে বেঁকে বসেন তার শ্বশুর বাড়ি ও বাবার বাড়ির স্বজনরা। করোনা হয়েছে কি-না সেটি নিশ্চিত না হয়ে দাফন না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন তারা।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়োজিত ৬ চিকিৎসককে বিনা নোটিশে বের করে দিয়েছে চিকিৎসকদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জন্য নির্ধারিত হোটেল মিলেনিয়াম। চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের রাখার জন্য কোনো আর্থিক লেনদেনের কথা না থাকলেও মিলেনিয়াম তাদের থাকা বাবদ খুমেককে ২৩ লাখ টাকার বিল পাঠিয়েছে।

যেসব বেসরকারি হাসপাতালে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা হচ্ছে তার মধ্যে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল অন্যতম। এ হাসপাতালটির বিরুদ্ধে বিলের জন্য এক করোনা রোগীকে আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রোগীর দুটি রক্ত পরীক্ষা, তিনটি এক্স-রে আর কিছু নাপা ট্যাবলেট সরবরাহ করে তারা বিল করেছিল দেড় লাখ টাকা। বিভিন্ন পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হয়।

হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় মারা যান সালেহ আহমদ। তার মৃত্যুর পর নিজের দুই সংসারের স্ত্রী-সন্তানরা হাসপাতাল থেকেই সটকে পড়ে। পরে ছোট ভাই লাশ গ্রহণ করে এম্বুলেন্সে করে বাড়িতে নিয়ে আসলে সেখানেও বাড়ীর সকলে সহযোগিতার অভাবে ঘরে তুলতে পারেননি মৃত ভাইকে।

গার্মেন্টস শ্রমিক নির্মল বৈদ্য করোনার উপসর্গ নিয়ে ঢাকা থেকে সরাসরি বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাবে নমুনা দিয়ে চন্দ্রহার গ্রামের বাড়িতে আসেন। পরে তিনি নিজ বাড়িতে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় পরদিন সকালে মারা যান। তার লাশ সৎকারে পরিবারের সদস্যসহ ওই ইউনিয়নের কেউ এগিয়ে আসেনি।

চট্টগ্রামের একটি পেট্রোল পাম্পে চাকরি করা সাহাব উদ্দিন হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে বাড়িতে আসেন। রাতে তার শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও কাশি বেড়ে বেড়ে গেলে পরদিন সকালে তিনি হাসপাতালে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত কিনা তা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়ে আসেন। দুপুরে বাড়িতে আসলে পরিবারের লোকজন তাকে একটি ঘরে বন্দী করে রাখেন। বিকেলে তার শ্বাসকষ্ট ও কাশি বেড়ে যায়। এসময় তিনি চিৎকার করতে থাকলে সবাই অন্যত্র চলে যায়। ছোট ছেলে এগিয়ে যেতে চাইলে তাকে বোনেরা বাধা দেয়। এভাবে চিৎকার করতে করতে রাত দশটার দিকে তার বাবার মৃত্যু হয়।

ভাবা যায়! যে মানুষগুলো জীবিত অবস্থায় তার সর্বস্ব দিয়ে প্রিয়জনকে কত যত্নে আগলে রেখেছিলেন, সেই প্রিয় মানুষগুলো আজ তার মৃত দেহটি পর্যন্ত স্পর্শ করছে না! যে মানষগুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তান কিংবা স্ত্রীর সুখের জন্য নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছেন, সেই সন্তানেরা বাবার লাশ রেখে পালিয়ে যাচ্ছে! স্ত্রী তার স্বামীর লাশ রেখে পালিয়ে যাচ্ছে! কিংবা মৃত্যুর পর লাশ বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে থাকলেও কেউ কাছে আসছে না।

এভাবে প্রতিদিন কত শত মৃত্যুর খবর আসছে, কি সহজ ভাবে! কে ভাবতে পেরেছিলো এমন কিছু হতে পারে জীবনে! আমাদের প্রত্যেকে যার যার জায়গা থেকে ভেবে নিয়েছি যে আমাদের করোনা হবেনা, কোভিড আমাদের ছুঁতে পারবেনা। করোনাভাইরাসটি এসে মানুষের ভেতরকার পাশবিক শক্তিগুলোকে যেন জাগিয়ে দিচ্ছে।

যারা প্রিয় মানুষটির জীবনের শেষ সময়টায় এমন আচরন করছি তারা কি ভেবেই নিয়েছি যে তাকে না ছুলেই আমরা নিরাপদ! হয়তো আপনি বেঁচে যাবেন কিন্ত হারাবেন প্রিয় মানুষটিকে। সময় আমাদের হাত ফষ্কে বেরিয়ে গেছে, এখন শুধু অপেক্ষা দুঃসংবাদের! দিন ফুরোলেই শুনবেন আপনার পাশের কেউ করোনা পজিটিভ আর নিজের চোখ কানকে বিস্মিত করে হুট করেই এক সময় জানতে পারবেন আপনি নিজেও আক্রান্ত!

দুজন মানুষের পাশাপাশি বসা এখন অস্বাভাবিক লাগে, বন্ধুদের দেখে দুর থেকে হাত নেড়েই হয়ত শুভেচ্ছা বিনিময় হবে আরো অগুনতি দিন মাস বছর! মনের ভেতর পরিবর্তন এসেছে, অদ্ভুত পরিবর্তন। বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করে খাওয়ার দিন, কাঁধে হাত রেখে আড্ডার মুহুর্ত, পাশে বসে বন্ধুর সাথে গলা ছেড়ে গান গাওয়া হবেতো আবার!

আপনারা কি দেখছেন না? বিশ্ব জুড়ে আজ মৃত্যুর মিছিল! এতো লম্বা অন্তহীন মৃত্যুর মিছিল আগে তো কখনো দেখিনি আমরা!!! তাই বলি সামনের দিনগুলোতে নিজের যে কোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হওয়ার এটাই সময়। এ রকম দিন আমার আপনার জন্যও আসতে পারে। কি হবে এতসব বিত্ত বৈভব আর ধন সম্পদ দিয়ে! সাথে কি নিয়ে যেতে পারবেন? কে খাবে চাল চুরি, তেল চুরির টাকা? করোনার কারনে যদি আপনার প্রাণটাও চলে যায়, তাহলে আপনার আপনজনও হয়তো আপনার লাশ রেখে পালিয়ে যাবে!

তাই আসুন একটু মানবিক আচরন করি। প্রিয় মানুষটিকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়ে চির বিদায় জানাই। আমার আপনার জীবনের এ সফলতার পেছনে সেই মানুষটির অবদানকে স্মরন করি। ভাল থাকুক পৃথিবী, ভাল থাকুক আমার প্রিয়জন।

লেখক: মোঃ জিয়াউল হক রাসেল, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক, রংধনু টেলিভিশন।

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...