নস্টালজিয়া (১ম পর্ব)

বিদিশা এরশাদ: আমার জীবনের প্রথম চাকরিটি ছিল একটি স্বনামধন্য চেইন ফাস্টফুড রেস্তোরাঁতে। ইংল্যান্ডের কেন্ট কাউন্টির ক্যানটারবেরি শহরটিতে আমরা থাকতাম। মূলত টুরিজম ও ধর্মীয় পিলগ্রিমেজ এর জন্য বিখ্যাত ক্যান্টারবেরি শহরটি। বিভিন্ন দেশের ট্যুরিস্টদের উপচেপড়া ভিড় ১২ মাস থাকতো। প্রথম বৈবাহিক সূত্রে সংসার যাত্রা শুরু হয় আমার এ শহরে স্টাউর নদীর তীরে। এখনো মনে আছে আমার বাড়ির জানালা থেকে ক্যান্টারবেরি ক্যাথেড্রেলের আলোর ঝটা দেখতে পাওয়া যেতো রাতে।

বাল্যবিবাহের খাতায় আমার নাম ওঠে ১৫ বছর বয়সে। ওই বয়সে বিয়ে বেআইনি হবে দেখে আমার স্বনামধন্য লেখক বাবা পাসপোর্টে আমার বয়স এক লাফে ৩ বছর বাড়িয়ে বড় করে দেন আমায়। এই বাড়তি ৩ বছর আমি বহন করে গিয়েছি মুখ চেপে। আমি কোনদিনই কোন কিছু নিয়ে প্রতিবাদ করতাম না আব্বার সাথে। ক্লাস নাইনে উঠে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি স্কুলের লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে বিয়ে দিয়ে ইংল্যান্ডে পার্সেল করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আমাকে। উদ্দেশ্য লেখাপড়া। আব্বার কঠোর নির্দেশ পালন করাই যেন ছিল আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আগে লেখাপড়া, পরে সংসার। একটি নামী দামী ব্রিটিশ প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি হই আমি শ্বশুরবাড়ির আগ্রহে। ওই পশ স্কুলের, ইউনিফর্ম, জুতো, টাই সবই ছিল পশ। স্টুডেন্ট রা সব ছিলো বিদেশি রিচ পরিবারের সদস্য।

যাই হোক, প্রথম চাকরিটা ছিলো আমার mcdonald’s এর টয়লেট ক্লিনার হিসেবে। সেই বয়সে আমি জানতাম না চাকরি করাটা কতটা আনন্দের বা কতটা কষ্টের। শুধু জানতাম আমাকে কাজ করতেই হবে। শুধু লেখাপড়া বা সংসার করতে আমাকে পাঠানো হয়নি। উপার্জন করাটাও ছিল বড় দায়িত্ব। গুরুজনের না বলা কথার মধ্যেই অনেক কিছু বুঝে গেলাম আমি। ‌‘a good daughter never says no to her parents’. বাবার সংসারের স্বচ্ছলতা আনতে আমার কাজ করাটা খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো।

আমার নিজের খরচ, আমার নিজের লেখাপড়া, আমার নিজের খাওয়া-দাওয়া, এগুলো কোন সমস্যা ছিলো না কোনেদিন। সব কিছু চাওয়ার আগে আমি পেয়ে যেতাম। বিলাসিতা না থাকলেও আমার আহ্লাদ ছিলো প্রচুর বিদেশি পরিবারের কাছে। ওই বয়সে বিলাসিতার চেয়ে ব্রিটিশ ডিসিপ্লিনে বেশি রাখা হতো আমাকে। তাই সপ্তাহে কিছু না কিছু গিফট থাকতো আমার জন্য। সেটা পেন্সিল বক্স, চকলেট, বুকস, টেডি বিয়ার এর মতো কিছু। কোন কিছুর যেন কমতি ছিল না আমার।

ব্রিটিশ আদলে বড় হতে থাকলাম আমি। কিছু দিন যেতে না যেতে শাশুড়ী মা আমাকে একটা সাইকেল কিনে দিলেন। আমরা বউ শাশুড়ি একসাথে মিলে স্ট্রবেরি তুলতে যেতাম স্ট্রবেরি ফার্মে। ছবি আঁকার জন্য জায়গা ও সরঞ্জাম দেওয়া হলো আমাকে। লেখালেখির জন্য দেয়া হতো ডায়েরি। নানা রকমের কেক, বিস্কিট বানাতেন শাশুড়ি মাম। আমি পেটুকের মত খেতাম আর হাত-পা নাচিয়ে নাচিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম। সব সময় আমার কথা বলার সাবজেক্ট থাকতো ক্যাম্পাস ও আমার মা বাবা ভাইবোনদের নিয়ে। ছোটো থাকতেই আমি খুব ভালো গাছে উঠতে পারতাম, যদিও সেগুলো ছিল আম গাছ, লিচু গাছ, পেয়ারা গাছ নারকেল খেজুর গাছ ও বাদ যায়নি আমার লিস্ট থেকে। তাই শাশুড়ির বাড়ির বাগানের আপেল, পেয়ারা, চেরি ফলগুলো গাছ থেকে পেড়ে নামাতাম। এতদিন যেগুলো পাখিরা খাচ্ছিল মনের আনন্দে। বাগানের ঝোপ-ঝাড় থেকে ব্ল্যাকবেরি কুড়িয়ে আনতাম স্কার্ট এর কোচ ভরে আমি। সেগুলো দিয়ে মাম অনেক জ্যাম জেলি বানাতেন আমার জন্য। মধ্যবয়সী, সোনালী রঙের ঢেউ খেলানো ছোট চুলের, ফর্সা, গোলাপী রং এর গালের ইংরেজ মেম সাহেব খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমাকে আপন করে নিলেন। সব সময় বলতেন এখন থেকে তুমি আমার ছোট মেয়ে। উনার বড় মেয়ে দুটো আমাকে ছোট বোন বলেই সম্বোধন করতো। ওনার ছেলের দেওয়া আমার প্রতি নির্দেশগুলো উনি পছন্দ না করলেও কোন আরগুমেন্ট করতেন না। জানতেন তার ছেলে এতটা নির্দয় কঠোর হওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই ভালো কোন যুক্তি আছে। এত ছোট বয়সে আমার চাকরি করাটা কষ্টের হলেও উনার ছেলের কোনো নির্দেশ আমি অমান্য করতাম না দেখে উনি লজ্জা পেতেন বেশ।

কিন্তু এ নিয়ে খাবার টেবিলে আলোচনা করেননি কখনো। উনারা সবাই বুঝতেন এছাড়া আমার অন্যকিছু করার কোন পথও ছিল না। কারণ আমার উপার্জন ছিল শুধু দেশে নিজের পরিবারের জন্যই। তাছাড়া দেশে ফিরে গিয়ে আবার স্কুলে ভর্তি হওয়াটা সম্ভব ছিল না আমার জন্য। আমার মা বলতো আমি যদি দেশে ফিরে আসি তাহলে উনি ওনার অন্য মেয়েদের কোনদিন বিয়ে দিতে পারবেন না আর।

মাম, ড্যাড ছুটির দিনে আমাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতেন। কোনো না কোনো ভাবে পুষিয়ে দিতেন আমার জমানো অভিমানগুলো উনাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রলেপ দিয়ে। আমার দুঃখ কষ্টকে তারা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন সব সময়। প্রায় রাতেই ঘুমাতাম আমি শাশুড়ি মামের সঙ্গে। বিদেশী মেম মামের বুকে দেশি মায়ের গায়ের গন্ধ হাতড়ে বেড়াতাম। পেতাম না আমার আম্মার সারাদিনের ক্লান্তির ঘামের গন্ধ সেখানে। তার বদলে কড়া গোলাপ, ল্যাভেন্ডার, ভ্যানিলার পারফিউমের ঘ্রাণ আমার নাকে লেগে ঘুম পাড়িয়ে দিতো রাতে। ঠিক যেমন ড্যাফোডিল ফুল শুঁকে গন্ধরাজের গন্ধ খুঁজতাম আমি। আমি বুঝতে শিখলাম আমার জন্য যা প্রয়োজন ছিলো সেটা আমি শুধু ব্যবহার করতে পারবো নিজের জন্য মাত্র। অন্যকে দিতে পারব না ।

হয়তো বা এই ব্রিটিশ আইন আমার গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ছিল। আজ এই কারণে আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদিশা হয়েছি। প্রথম দিন ম্যাকডোনাল্ডসের সুপারভাইজার আমাকে ইউনিফর্ম ও একটা বড় মাপের মপ দিয়ে বললো তোমার কাজ প্রতিদিন টয়লেটটা পরিষ্কার রাখা, চক্ষু চড়কগাছ আমার। কী বলে ওই লোকটি। ও কি জানে যে কোনো দিন আমি ঘর ঝাড়ু দেইনি, পানিও ঢেলে খাইনি। আমাদের রাজশাহীর বাড়িতে সকালবেলা ঝি এসে ক্লিন করে দিতো বাথরুমগুলো। এবং সেই ঝি বাড়ির অন্য কোন কাজ করতে পারত না আর। এটা আমি পারবো না। এটা আমাকে দিয়ে কোনদিন হবে না। মিষ্টি হাসি দিয়ে উনি বললেন যতবার গেস্টরা ব্যবহার করবেন ততবার তুমি নিজে মুছে আসবে টয়লেট। নতুন চাকরির এক্সাইটমেন্ট থেকেও বেশি ছিল আমার লজ্জা বোধ। এই বুঝি কেউ আব্বাকে জানিয়ে দেয় আপনার মেয়েতো লন্ডনের টয়লেট পরিষ্কার করছে।

যদিও আমার এলাকাটায় কোন বাঙালি মেয়ে ছিলো না, আমি ১৯৮৫ সালে কথা বলছি। লন্ডনেই বেশি বাস করত সিলেটি পরিবাররা। পুরুষরা রেস্টুরেন্টে। আর বাসায় মেয়েরা। সংসার, সন্তান দেখাশোনা করতো তারা। যেমন ভাবে তারা বাংলাদেশে ছিল, ঠিক তেমন লন্ডন শহরে এসেও। নিজেদের মধ্যে নিজেকে নিয়ে গুটিয়ে থাকতে পছন্দ করতো তারা। ইংরেজিতে কথা বলতে তারা কখনোই সাহস করতো না। শুদ্ধ বাংলার থেকে সিলেটি ভাষায় কথা বলতে পছন্দ ইংরেজিতে কথা বলতে তারা কখনোই সাহস করতো না শুদ্ধ বাংলা থেকে সিলেটি ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত তারা নিজ কমিউনিটিতে। দু’একজন অবশ্য ব্যতিক্রম ছিলো না যে আবার তা নয়। যেমন আমার বড় ফুপি ছিলেন এক্সেপশনাল লেডি। সে আমলে লন্ডনে ডিপ্লোম্যাটের বউ ছিলেন । উনি লম্বায় ছিলেন ৫ ফিট ৮ বা ৯ ইঞ্চি। আমার মতনই। বব কাট চুল ছিলো তার। ওয়েস্টার্ন কাপড় পরে, লাল রঙের দামী গাড়ি নিজে ড্রাইভ করতেন লন্ডন শহরে। আমার শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তাদের চমৎকার সখ্যতা হওয়ার পরেও আমি বাড়তি সুবিধা পাইনি কোনদিন। বরং বাস্তবতা আমাকে শিখিয়ে দিলো নিজের দু’হাতের ওপর ভর দিয়ে দু’পায়ে চলতে।

আব্বাকে না জানিয়ে মাকে আমাকে টাকা পাঠাতাম সংসারের অভাব এর বদলে স্বচ্ছতা উঁকি দিলো। দ্রুত বদলাতে শুরু করলো দিনগুলো। সে আমলে তেমন চাহিদা ছিলো না আমার মায়ের। মাঝেমধ্যে বায়না করতেন রান্নাঘরে দু’একটা জিনিস পত্রের জন্য জন্য। দু-একটা নতুন চকচকে ফার্নিচার ও যোগ দিলো বাড়িতে শুনলাম। ভাই বোন বড় হওয়ার সাথে সাথে খরচ ও বাড়তে থাকলো তাদের। আমি ছাড়া আর কে-ই বা পূরণ করবে তাদের এই বাড়তি আবদার। কিন্তু কখনো একটা বার জিজ্ঞেস করতেন না তুমি কী চাকরি করো? কোথায় করো? তোমার কোনো কষ্ট হয় কি না। আমার ভালো-মন্দ হয়তো আব্বা কৌশলে জেনে বলতেন কাজের জন্য যেন আমার লেখাপড়া বিঘ্ন না হয়। তাই লেখাপড়া বা সংসার করার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো আমার কাছে আমার চাকরি। সবকিছু আমি সমানতালে করেছি।

আব্বা বরাবরই উদাসীন ছিলেন আমার মা ও তার সংসারের প্রতি। যতটুকু প্রয়োজন ছিল অতটুকুই দায়িত্ব পালন করতেন তিনি ।যেহেতু বাবার ন্যাওটা ছিলাম আমি, তাই বাড়তি খরচটা একমাত্র আমার জন্য করে আব্বা আনন্দ পেতেন। মেয়ে হয়েও কি স্টাইল করে পাড়ার দর্জি দিয়ে বাহারি শার্ট প্যান্ট বানিয়ে পরাতেন আমাকে আমার আব্বা।

আমি চলে যাওয়ার পর মনে হয় না আমার জায়গা নিতে পেরেছে আমার অন্য বোনেরা। আমাদের বাড়িতে দুটো বড়ো কাসার থালা ছিল। একটা আব্বার জন্যে, অন্যটি আমার। সেই বড় থালার ওপরে কাঁসার বাটিতে আলাদা আলাদা তরকারি পরিবেশন করা হতো। আব্বা ও আমি খাবারের আইটেম বেশি পেতাম অন্য ভাই বোনদের তুলনায়।

ওপার বাংলার কালচারটা খুব বেশি প্রচলন ছিল আমাদের বাড়িতে। আমার দাদা বাড়ি ছিল কলকাতার হুগলি শহরে। দাদু ব্রিটিশ একটা কোম্পানিতে অফিসিয়াল চাকরি করতেন। কলকাতা থেকে পরে বর্ধমানের সেটেল হয় দাদু। বর্ধমান কলেজে বাবা ও বড় ফুপু ও পড়াশোনা করতেন ।

কলকাতায় গেলে আজও যে আমি নাড়ির টান অনুভব করি সেটা আমার বাবা, দাদু থেকেই পাওয়া। প্রচুর কবি-সাহিত্যিকরা ওপার থেকে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের আমাদের বাসায় আব্বার সাথে দেখা করে যেতেন। ওপার বাংলার বড় বড় শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, গুণীজনেরা নিয়মিত আসতেন। আবার আব্বাও বছরে তিন-চারবার করে সাহিত্য, বই প্রকাশনার কাজে কলকাতায় যেতেন। আমাকেও নিয়ে যেতেন উনি। আমার ছোট্ট জীবনে আমি অনেক বড় বড় মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি যেমন হেমন্ত মুখার্জী, সলিল চৌধুরী, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সুনীল গাঙ্গুলী আরও কতজন। পশ্চিম বাংলা অনেক পলিটিশিয়ানরা ও ছিল বাবার পরিচিত যেমন জ্যোতি বসু। সবার নাম মনে নেই আজ আমার। আমাদের বাড়িতে দেওয়ালে বাবার সাথে কবি বিষ্ণু দে, নায়ক উত্তম কুমার, মাদার তেরেসার মত গুণীজনদের ছবি টাঙানো থাকতো যত্নে। আমার নিজের স্মৃতিশক্তি আবছা হয়ে যাবার আগেই ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করতে হবে এগুলো। না হলে বয়সের সাথে সাথে একদিন আমারও স্মৃতিভ্রম হতে পারে।

কলকাতা থেকে দেশে ফিরে যাবার সময় আব্বা আমার জন্য একটি হিরো সাইকেলে নিয়ে ফিরলেন। দুরন্তর আমি মনের সুখে সেই সাইকেল চালিয়ে ক্যাম্পাসের এক মাথা থেকে আরেক মাথা চড়াতাম। কলকাতায় আব্বার সাথে আমার ভ্রমণকাহিনীর অভিজ্ঞতাগুলো আপনাদের অন্য একদিন শুনাবো সময় করে।

ক্যাম্পাসের সবাই তখন আমাকে আদর করে ডাকতো পাগলী নামে। সবাই খুব ভালোবাসতো আমাকে। ক্যাম্পাসের অন্য শিক্ষকরা ছোটবেলায় বিদেশি সাথে আমার বিয়েটা ভালো চোখে দেখেনি। যদিও পিটারকে সবাই চিনতো ও ভালোবাসতো আলাদাভাবে। কিন্তু ১৫ বছর বয়সের গ্যাপের বিয়েটা তারা মেনে নিতে পারেনি ভিন্নধর্মীর সাথে। আব্বাকে তিরস্কার করতে বাদ দেয়নি অনেক প্রফেসররাও।

আর আজ বাথরুম পরিষ্কার করছে সেই পাগলী ।

জীবন থেকে যে জিনিস শিখলাম আমি সেটি হলো ফিনান্সিয়ালি কারো ওপর নির্ভর করা যাবে না। সেই বাবা-মা হোক বা স্বামী, আর সন্তান তো প্রশ্নই আসে না। যত তাড়াতাড়ি বুঝে নেয়া যায় তত তাড়াতাড়ি ইমোশনগুলো বোতলে ভরে রাখা উচিৎ। আমিও তাই করলাম। আমার দামী জামা জুতো খুলে, রেস্তোরাঁর একটা ইউনিফর্ম পরে, প্লাস্টিকের বুট জুতো পায়ে, হাতে প্লাস্টিকের গ্লাভস লাগিয়ে মন দিয়ে কাজ শুরু করলাম, এক হাতে মপ অন্য হাতে হারপিক নিয়ে। মনকে শক্ত করে নিলাম। সাদা চামড়ার বৃটিশরা যদি বাথরুম ক্লিন করতে পারে আমি শ্যামলা বর্ণের বিদিশা কেন নয়। এটাইতো ইতিহাস বলে। ওইটুকুন বয়সে ইগো থেকে লজ্জাই বেশি ছিলো। সমস্তটুকু লজ্জা ঝেড়ে কাজে মন দিলাম। ক্লিনার হিসেবে বাথরুম পরিস্কারে কাজ।

এর কয়েক মাস পরেই আবার আরেকটি কাজ নিলাম। আর একটা ছিল পিজ্জা হাটে। নিজের কাছে মনে হচ্ছিল একটা প্রমোশন হয়েছে আমার। বাড়িতে কথা বলার মতো তেমন মানুষ ছিল না। আমি যার সাথে সংসার করতাম তার সাথে কথা বলতাম না বেশি। তিনি বেশিরভাগ সময় ডুবে থাকতেন বইপত্র রিসার্চ এর ভিতরে। গুড, ভেরি গুড, এক্সসিলেন্ট বা গ্রেট। সবসময়ই আমাকে প্রেইজ করতেন। এই যে একজন প্রফেসর এর স্ত্রী হয়েও আমি ক্লিনারের জব করি এটা নিয়েও তার কোনো রকম ঘৃণা, অবজ্ঞা ছিলো না। তিনি খুব বেশি চেয়েছিলেন— আমি জেনো ইন্ডিপেন্ডেন্ট একজন মেয়ে হই। আমি যেন সব পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারি। সবসময়ই আমাকে তিনি পজেটিভ কাউন্সেলিং করতেন। মনোবল যেন আমার না ভেঙে যায় খেয়াল রাখতেন। বাথরুম থেকে রান্নাঘরে কাজটা অনেক সাবধানী ও পরিশ্রমী। যেহেতু কাচের থালা বাটির ধোয়ার ব্যাপার ছিল। সেই থেকে থালাবাটি ধোয়া কাজটি আজও আমার প্রিয়। পিজ্জা বানানো দেখতে দেখতে আমি নিজে ভালো পিজ্জা বানানো শিখে ফেললাম একসময়। আমার রান্নার কারিশমাটা শুরু হলো সেই বয়স থেকেই। এই ভাবেই জীবনে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কিচেন থেকে আমি রান্না শিখি। থালা বাটি ধোয়া থেকে বাবুর্চির পদে ও আমার চাকরি হলো একটা সময়।

বাঙালি, ইন্ডিয়ান রান্না ভালো না পারলেও ইউরোপিয়ান বা অন্য দেশের রান্নার পারদর্শী হয়ে গেলাম দ্রুত।

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...