ক্ষয়িষ্ণু নৈতিক মূল্যবোধ: মুক্তির পথ কোথায়?

মো. মাহমুদ হাসান: দুই মাসের মাথায় অস্ত্র মামলায় প্রতারক সাহেদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া সুখবর। ফেনীতে কেরোসিনের আগুনে পুড়িয়ে মারা নুসরাতের মামলায় দাপুটে আওয়ামী লীগ নেতাসহ সব আসামিকে চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে, ভিডিও ধারণকারী ওসিকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছে, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এম সি কলেজ ছাত্রাবাসে বর্বরতম ঘৃণিত নারকীয় উল্লাসে মেতে ওঠা পশুদের তড়িৎ গতিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন সময়ে বেগমগঞ্জে ঘটে যাওয়া আর একটি নারকীয় তাণ্ডবে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের বাঙালির হৃদয়ে আজ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, বিস্ময়ে বিমূঢ়, ক্ষোভে ভারাক্রান্ত। আমার জেলা হবিগঞ্জের এক দৈনিক পত্রিকায় আজ তিনটি ধর্ষণের শিহরণ জাগানিয়া সংবাদ, সারা দেশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নারী নিরাপত্তায় কতটা আতংকের হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আমলে নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তৃণমূল থেকে জাতীয় সংসদ, মাঠ প্রশাসনের সর্বনিম্ন স্তর থেকে সচিবালয়, নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট অবধি আমাদের গর্বিত মেয়েরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে, উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে ভূমিকা রাখছে জাতিসংঘসহ সব উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা একে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ইদানিং কালের নারী নির্যাতনের ভয়াবহ বিভৎস রকমের নানাবিধ সংবাদ সব অর্জনকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ফেলে দিয়েছে।

প্রিয় দেশের নারী নিপীড়নের বিভৎস খবর সংবলিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবি দেখিয়ে আমার স্কুল পড়ুয়া তের বছর বয়সী সন্তানকে যখন তার বন্ধু প্রশ্ন করে- এটি ই কি তোমার বাংলাদেশ? ভীষণ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে স্কুল থেকে বাসায় ফিরে প্রিয় ছেলেটি যখন আমায় তীর্যক প্রশ্নবাণে তার বিক্ষুব্ধ হৃদয়ের অনুভূতি প্রকাশ করে, একজন বাংলাদেশি পিতা হিসেবে আমার মতো হাজারো পিতা মাতার মনের দহনটি পাঠ করার মতো উদারতা আমার প্রিয় দেশের সমাজপতি, শাসক আর রাজনীতিবিদদের আছে কি?

একাত্তর জার্নালে মিথিলা ফারজানার প্রশ্নের জবাবে র‍্যাব মুখপাত্র আশিক বিল্লাহ বেগমগঞ্জের একলাছপুরের জঘন্যতম ঘটনার প্রেক্ষিতে জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে র‍্যাবের নজরে আসামাত্রই তারা ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে তৎপর হয়ে ওঠেন। বাহিনী প্রধান দেলোয়ার ও প্রধান আসামি বাদলকে গ্রেপ্তারে যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তাতে র‍্যাব সাধুবাদ পেলেও, একমাস পর স্তানীয় সাংসদ মামুনুর রশীদ কিরণ আর পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি জেনেছেন, এমন তথ্যে নানাবিধ প্রশ্ন ও সন্দেহের উদ্রেক হওয়া কি অবান্তর? একজন জনপ্রতিনিধি তার এলাকায় গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী বাহিনীর কথা যদি নাই জানতে পারেন, কোন বিবেচনায় তাকে জন সম্পৃক্ত সাংসদ বলা যাবে? জন প্রতিনিধি হওয়ার কোন নৈতিক অধিকার তিনি দাবি করতে পারেন কি? প্রথম চিনতে না পারার ভান করলেও, প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে বাহিনী প্রধান দেলোয়ার ও তার শিষ্যরা আগে ভালো ছিলো বলে সাফাই গান, তাতে জনমনে বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হলে, কোন বিবেচনায় তা প্রত্যাখ্যান হতে পারে? এমসি কলেজের নৃশংস ন্যাক্কারজনক ঘটনার ক্ষেত্রেও, বাবলা চৌধুরীর বক্তব্য প্রমাণ করে নেশাখোর পাষণ্ডদের সংগে নেতা নামধারী ভণ্ডদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এসব ছায়া দানকারী অমানুষেরা কোনভাবেই কোন রাজনৈতিক আদর্শের ধারক হতে পারে না, এই লেবাসধারী দুর্বৃত্তরা চেতনার মুখোশ পরে, সমাজকে ইয়াবায় সয়লাব করে, শাসকের আনুকূল্যে অবৈধ অর্থ বিত্তের মরণ নেশায় মত্ত হয়ে সমাজকে ধ্বংসের যে নিষ্ঠুরতম খেলায় মেতে উঠেছে তার ই বহিঃপ্রকাশ সিলেটের এম সি কলেজ আর বেগমগঞ্জের একলাছপুরের কলঙ্কজনক ইতিহাস ; এ কোন ভাবেই সমাজব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনার প্রতিচ্ছবি নয়।

ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের সিলেটের এক সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘৃণাভরে দলে অনুপ্রবেশকারীদের কাউয়া বলে যে জনপ্রিয় কাউয়া তত্ত্বের জন্ম দিয়ে ছিলেন, পাকা ধানের মাঠ থেকে তিনি কাউয়া তাড়াতে কতটা সক্ষম হয়েছেন জানি না তবে সাম্প্রতিক কালের জনমনের বাসনা ‌‘ধর্ষণকারীর জন্য কোনো রাজনৈতিক দল যেন আশ্রয়ের ঠিকানা না হয়’ এটিতে সফল হলে অমানিশার অন্ধকার ভেদ করে আলোর দেখা মিলতেও পারে।

বিক্ষোভে উত্তাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ক্ষোভে, ক্রোধে ফুঁসে উঠেছে দেশের মানুষ। অধিকাংশের দাবি নরপশুদের ক্রসফায়ার, কেউ বা চায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, অনেকে নানাবিধ বিকল্পের কথাও বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা হানিফ ও সেদিন ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের সভায় ক্রসফায়ারের দাবী তুলেছেন। সকলের দাবি যখন এক মোহনায়, এই দুঃসহ ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি রুখে দেয়ার এখনি তো মোক্ষম সময়। সব শ্রেণিপেশার মানুষের আবেগ ও দাবীর প্রতি একাত্মতা ও সশ্রদ্ধ সম্মান রেখে বলতে চাই, পাহাড় আর সৈকত সৌন্দর্যের লীলাভূমি টেকনাফে দু’শতাধিক ক্রসফায়ার কি ইয়াবা রাজ্যের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে? একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের পথে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক নয় কি? লাখ লাখ বিপথগ্রস্ত তরুণদের ক্রসফায়ার কি নতুন নতুন ধর্ষক তৈরীর সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেবে? যদি তাই না হয়, দ্রুত এসব বিপথগামী আর তার ছায়াদানকারী লোভী, দুর্নীতিবাজ, মাদক সম্রাট, আদর্শের বুলি আওড়ানো ধোঁকাবাজদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজ সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আইনের শাসন ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই কি নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনার সর্বোত্তম পন্থা হতে পারে না!

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
ক্যালগেরি, আলবার্টা, কানাডা

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...