অবরুদ্ধ সময়ের ডায়েরি ‘যত কষ্টই হোক’

ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়:
মনুষ্যজীবন প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ মাত্র! একবিংশ শতাব্দীর মানুষেরা বোধকরি চলমান এই ভাইরাস-যুদ্ধের কথা এইভাবে কখনও কল্পনা করিতে পারে নাই, করোনাভাইরাস যেইভাবে চোখে আঙুল, কানে পানি দিয়ে দেখিয়ে-শুনিয়ে দিতেছে। এই ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি মানুষ এখন স্বেচ্ছা-গৃহবন্দি। প্রশ্ন আসতে পারে, একজন মানুষ কতদিন যাবত ‘স্বেচ্ছায় ‘ গৃহকোণে অন্তরীণ থাকতে পারেন? কিংবা সরকার কতদিন অবধি নাগরিকদের গৃহবন্দী রাখতে পারে! সর্বশেষ বড় মহামারি দেখা দিয়েছিল শতবর্ষ পূর্বে। স্প্যানিশ ফ্লু’তে ১৯১৮ সালের জানুয়ারি হইতে ১৯২০-এর ডিসেম্বর অবধি দুই বছরের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। মৃত্যু হয়েছিল ৫ কোটি মানুষের! করোনাভাইরাসে যেমন মৃত্যুহার সবচাইতে বেশি বয়স্ক মানুষদের মধ্যে, স্প্যানিশ ফ্লু ছিল করোনার বিপরীত। ওই ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে সবচাইতে বেশি মৃত্যু হয়েছিল ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের। স্প্যানিশ ফ্লু’তে কেউ  আক্রান্ত হওয়ার পর তাহা ভালো করিয়া অনুধাবনের পূর্বেই  অনেকের মৃত্যু হয়েছে বা হতো- এতটাই ভয়াবহ ছিল ওই সংক্রমণ। বিষয়টা অনেকটা এইরকম  ছিল, কোনও ব্যক্তি হয়তো ঘুম হতে উঠে নিজেকে বেশ দুর্বল বোধ করিতো, তিনি দৈনন্দিন সকল কাজ গুছিয়ে হয়তো কাজে বাহির হবেন, দেখা গেল একটু পরই তার জ্বরের সাথে শ্বাসকষ্ট এমনকি বমির সাথে নাক দিয়ে রক্তপাত শুরু  হতে দেখা গেলে আক্রান্তের সঙ্গিন অবস্থা। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল মাত্র। ইউরোপে অস্থিরতা, ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ, সব মিলিয়ে স্প্যানিশ ফ্লু হতে বাঁচার জন্য বিশ্বব্যাপী ব্যাপকহারে গৃহে অন্তরীণ থাকার প্রচলন তখন কেউ প্রদান করে নাই। সকল কাজকর্মই অব্যাহত রেখেছে এবং লকডাউনের তেমন কোনও ঘটনাও ঘটে নাই। তার ফলশ্রুতিতে ব্যাপক হারে ছড়িয়েছিল সেই মারণ সংক্রমণ। কিন্তু এইবার বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যখন লকডাউনের কারণে গৃহবন্দী হতে বাধ্য হয়েছে! আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর কারাবাসের দিনগুলির কথা জানি, নেলসন ম্যান্ডেলার কনডেম সেলে প্রায় তিন দশক বন্দি থাকার কাহিনী জানি, কাজী নজরুলের নির্জন কারাবাসের কাহিনী জানি, কিন্তু জানি না বিশ্বব্যাপী এমন কোটি কোটি মানুষের অদ্ভুত গৃহবন্দী দিনের কথা। সকলেই তো আর বঙ্গবন্ধু- ম্যান্ডেলা কিংবা কাজী নজরুলের মতো মানসিক শক্তি ধারণ করেন না। সেই কারণে বন্দিত্বের এই শিকল যেন আঁকড়ে ধরেছে কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে। করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী যেই আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছে, যেই হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর মিছিল ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে, সেই সকল সঙ্কটের পাশে করোনা- উত্তর কোটি কোটি মানুষের মানসিক বিকারের জগতও এই বিশ্বকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করবে। আমরা এখনও জানি না, কতদিন গৃহঅন্তরীণ থাকলে দেখা মিলবে করোনা- উত্তর যুগের। কত সপ্তাহ, কত মাস এই ভাবে পার করতে হবে? কিন্তু এইটুকু কেবল বলা যায়, এই বিশ্ব নতুন করে চিহ্নিত হবে করোনা পূর্ব এবং করোনা উত্তর যুগ হিসাবে। সেই নতুন যুগের হিসাবটা সকল দিক হইতে জটিল হবে। তারপরও, যত কষ্টই হোক, লকডাউনেই থাকতে হবে প্রতিটি দেশের সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী। এটাই এই রোগের এখনও পর্যন্ত একমাত্র দাওয়াই। কারণ, তৃতীয় ও চতুর্থ স্টেজে এই মরণ ভাইরাস গোষ্ঠীগতভাবে সংক্রমিত হইতে থাকে। সংক্রমণ বৃদ্ধি পায় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের দ্বারা। আবার যাতায়াতের সময় বাস-ট্রেনে, বা গণপরিবহনে সহযাত্রীদের থেকেও ছড়াতে পারে এই মরণ ভাইরাস। তাই এটা রুখতে একমাত্র এবং অভিন্ন পথ হইল লকডাউন। যা একের সহিত অন্যকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া। তবে সামাজিক দূরত্ব অবশ্যই সাময়িক, যতক্ষণ না করোনাভাইরাসকে পরাজিত করা যাচ্ছে। আমরা ঘরে, করোনা দূরে। শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। মাহে রমজানের পবিত্রতা অনেকাংশে সহজ করে তুলবে বলে বিশ্বাস।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ।

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
Loading...