আইয়ুব বাচ্চু: রূপালি গিটার ফেলে যাওয়ার দুই বছর আজ

মহিউদ্দিন আল মাহি: কিশোর বয়সেই প্রেমে পড়েছিলেন গিটারের, এই সুরযন্ত্রের সঙ্গে বেঁধেছিলেন মনপ্রাণ। তাঁর গিটারের অপূর্ব মূর্ছনা ও কণ্ঠের জাদুতে মাতিয়ে রাখত সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়। তিনি তার অপূর্ব কণ্ঠে গেয়েছিলেন- এই রুপালি গিটার ফেলে/একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে/সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো/গোপন করে। প্রিয় রুপালি গিটার ফেলে সত্যিই অনেক দূরে চলে গেলেন গিটারের জাদুকর ও জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। দুই বছর আগে আজকের এইদিনে হৃদযন্ত্রে আক্রন্তে হয়ে লাখো ভক্তকে কাঁদিয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন দেশের জনপ্রিয় এই ব্যান্ডশিল্পী।

আজ কিংবদন্তি ব্যান্ড শিল্পী ও গিটারিস্ট আইয়ুব বাচ্চুর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

১৮ অক্টোবর ২০১৮ আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতাল। কিংবদন্তি শিল্পীর আকস্মিক প্রস্থানে হতবিহ্বলতার ছাপ দেখা যায় হাসপাতালে আসা প্রতিটি মানুষের মুখে। প্রিয় বিদায়ী এই মানুষটিকে দেখতে আসেন নবীন-প্রবীণ থেকে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী, অভিনয়শিল্পী, রাজনীতিবিদসহ নানা পেশার মানুষ।

সেই দিন জাদুকরী এই শিল্পীকে শেষবারের মতো দেখতে এসে, কিংবদন্তী শিল্পী এন্ড্রু কিশোর বলেছিলেন, গায়কির বিবেচনায় এখন পর্যন্ত এ দেশের তিনি এক ও অদ্বিতীয় শিল্পী। স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নিজস্ব ধারার মিশেলে অনন্য এক শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। বছর বছর এমন শিল্পীর জন্ম হয় না। নতুন প্রজন্ম যদি তাঁর গায়কির ধরন থেকে কিছুটাও শিখতে পারে, সেটাই হবে তাঁর প্রতি ভালোবাসা জানানোর সুন্দরতম কৌশল।

আইয়ুব বাচ্চু ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই গিটার বাজাতে, গান গাইতে ভালোবাসতেন। তবে বাঙ্গালদেশের ব্যান্ডের সঙ্গে তাঁর যাত্রা শুরু ১৯৭৮ সালে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের মাধ্যমে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে তিনি ‘সোলস’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’ প্রকাশ হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। তাঁর সফলতার শুরু দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ১৯৮৮ সালে ‘ময়না। এরপর ১৯৯১ সালে বাচ্চু ‘এলআরবি’ ব্যান্ড গঠন করেন। এই ব্যান্ডের সঙ্গে তাঁর প্রথম ব্যান্ড অ্যালবাম ‘এলআরবি’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। এই অ্যালবামের ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’ ,‘ঘুম ভাঙ্গা শহরে’, ‘হকার’ গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়।

১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে তাঁর জনপ্রিয় অ্যালবাম ‘সুখ’ ও ‘তবুও’ বের হয়। ‘সুখ’ অ্যালবামের ‘সুখ’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’, ‘গতকাল রাতে’ আলোড়ন তৈরি করে। এর মধ্যে ‘চলো বদলে যাই’ গানটি বাংলা সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় গান। গানটির কথা লিখেছেন ও সুর করেছেন বাচ্চু নিজেই। ১৯৯৫ সালে তিনি বের করেন অ্যালবাম ‘কষ্ট’। সর্বকালের সেরা একক অ্যালবামের একটি বলে অভিহিত করা হয় এটিকে। এই অ্যালবামের প্রায় সব গানই জনপ্রিয়তা পায়। অ্যালবামের ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘অবাক হৃদয়’, ও ‘আমিও মানুষ’। একই বছরে ‘ঘুমন্ত শহরে’ প্রকাশিত হয়। সেটিও সাফল্য পায়। আইয়ুব বাচ্চুর সর্বশেষ তথা দশম অ্যালবাম ‘জীবনের গল্প’ প্রকাশ হয় ২০১৫ সালে।

আইয়ুব বাচ্চু শুধু অডিও গানে নয়, প্লেব্যাকেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। তাঁর গাওয়া প্রথম প্লেব্যাক কাজী হায়াতের ‘লুটতরাজ’ ছবির ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় গান। এ ছাড়া মান্না অভিনীত ‘আম্মাজান’ ছবির শিরোনাম গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

আইয়ুব বাচ্চুর দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে শিল্পী নকীব খান নিউজনাউকে জানান, ‘আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পীর কারণে এ দেশের ব্যান্ডসংগীত শ্রোতার অন্তরে স্থান পেয়েছে। তিনি আমাদের এবং দেশের ভবিষ্যৎ মিউজিসিয়ান দের জন্য রেখে গেছেন কালজয়ী অনেক গান। তাঁর গাওয়া সেই গানগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা করছি আমরা , যাতে শত বছর পরের শ্রোতারাও তার গাওয়া সেসব গান শুনতে পায়।

বাংলাদেশের জনবপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীনের বেইজ গিটারিস্ট জিয়াউর রহমান নিউজনাউকে বলেন। দেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের জন্য আইয়ুব বাচ্চুর অবদান অতুলনীয়। বর্তমান প্রজন্মের জন্য বাচ্চু ভাই ছিলেন একটি মিউজিক্যাল ইনিস্টিউট। এক কথায় বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের বিপ্লব ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তার মৃত্যুতে তার পরিবারের যেমন ক্ষতি হয়েছে তেমনি আমাদের দেশের ব্যান্ড মিউজিকের এক বিশাল ক্ষতি হয়েছে।

এর আগে গত শুক্রবার কিংবদন্তি ব্যান্ড শিল্পী ও গিটারিস্ট আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর দিনটি সামনে রাখে তাকে স্মরণ করছেন তার দুই সন্তান ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব ও আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব। আইয়ুব বাচ্চুর প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড এলআরবি’র ভেরিফায়েড ফেইসবুকে শুক্রবার তারা একটি পোস্ট দেন।
তারা লেখেন,
‘বাবুইকে ছাড়া চলে গেল দুই বছর।
আরও ক’বছর এভাবে যাবে জানি না।’

 

নিউজনাউ/এমএম/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...