সামনের পথটা আরও কঠিন হবে অর্পিতার!

নিজস্ব প্রতিবেদক: মায়ের সঙ্গে কখনো দুষ্টুমি করা হয়নি মেয়েটির। চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফোটা হয়নি তার। কিংবা ভোরের বেলায় ডালের উপর কচি পাতায় নিয়তি কখনো লুটোপুটি খেতে দেয়নি মেয়েটিকে। কারণ মা শব্দটি জানার কিংবা বোঝার আগেই যে মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে।

২০০৩ সালের আগস্টে মা যখন মারা যায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে, অর্পিতার বয়স তখন সবেমাত্র আট মাস। তাই মা শব্দটি কিংবা মা নামের সেই পরম মমতাময়ী ব্যক্তিটিকে আর জানা হয়নি তার। আর বাবা! সেতো মায়ের অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলো স্ত্রী-সন্তানের কাছ থেকে। ১৭ বছর ধরে অর্পিতার তাই জানা হয়নি বাবা কেমন। বাবার মুখটাই যে তার কিশোরী মনে আঁকা হয়নি কখনো।

এ গল্প মেহজাবীন অর্পিতার। এই গল্প অদম্য এক মেধাবীর। এই গল্প জীবনের কাছে এখন পর্যন্ত হার না মানা এক কিশোরীর। সেই যে আট মাস বয়স, যখন মাকে হারালো, এক অর্থে হারালো বাবাকেও। সেই থেকে নানা-নানীর কাছে তাদের সন্তান হয়েই বেড়ে ওঠা। নাতনীকে আকড়ে ধরেই প্রিয় সন্তান হারানোর কষ্ট ভুলে ছিলেন বৃদ্ধ নানা-নানী। অর্পিতার জন্যই নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন তারা।

অর্পিতার লেখাপড়ার হাতেখড়ি ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে। ঠাঁই হয় মামার সংসারে। তিন বছর পরে সেখান থেকে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় খুলনায় বড় খালার কাছে। নৌ-বাহিনী স্কুল থেকে এ+ নিয়ে শেষ হয় তারা প্রাথমিকের গন্ডি। এরপর সপ্তম শ্রেণীতে মেধাবী অর্পিতা ভর্তির সুযোগ পায় মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুল, খুলনাতে। দিনদিন বাড়তে থাকে লেখাপড়ার খরচ। সীমিত আয়ের মামার পক্ষে সেই খরচ বহন করা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনা। যোগাযোগ করা হয় অর্পিতার বাবার সঙ্গে। যেন নিজের সন্তানের পড়ালেখার খরচটা অন্তত বহন করে সে। কিন্তু বৃথা যায় সব চেষ্টা। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কিছুই করতে রাজি হননি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরেরর কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান মৃধা। কিন্তু থেমে যায়নি অর্পিতার পথচলা। এমসিএসকে থেকে তাকে নিয়ে আসা হয়। ভর্তি করিয়ে দেয়া হয় খুলনার নেভি অ্যাঙ্কোরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজে।

ততদিনে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে অর্পিতা। বুঝতে শিখেছে জীবনের বাস্তবতা। তাইতো কখনো ক্ষুধা পেটে নিয়ে, কখনোবা পায়ে হেঁটে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে কোচিং করতে হয়েছে তাকে। তবু থেমে যায়নি মেয়েটি। আপোষ করেনি নিজের সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে। দিনরাত ডুবে থেকেছে শুধু বই নিয়ে। একটা ভালো জামার স্বপ্ন দেখেনি কখোনো। কারণ জীবনের সংগ্রাম তাকে বিলাসিতার স্বপ্ন দেখতে দেয়নি।

অসুস্থ নানা/নানীর উৎসাহ আর নিজের অধ্যবসায় অর্পিতাকে সাহস যুগিয়েছে সব সময়ই। তার ফলও পেয়েছে সে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ পেয়েছে জীবনের শুরুতেই সবকিছু হারানো এই মেয়েটি।

এখন স্বপ্ন দেখতে সাহস পায় অর্পিতা। সাহস পায় আরো বহুদূর এগিয়ে যেতে। মেধাবী এই মেয়েটি পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারলে হয়তো একদিন চিকিৎসক কিংবা প্রৌকশলী হতে পারবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় স্বপ্ন দেখে সে। স্বপ্ন দেখে ভালো মানুষ হওযার। স্বপ্ন দেখে সেই মানুষটি হওয়ার- যে কখনো আপনজনকে দূরে ঠেলে দেবে না।

অর্পিতার এই গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু সেটা বুঝি হওয়ার নয়। সবেতো এসএসসি’র গন্ডি পাড় করলো, বাকিটা পথ পাড়ি দেবে সে? ১৭ বছর ধরে যে মামা নিজের সন্তানের কথা না ভেবে শুধুমাত্র মৃত বোনের সন্তানের জন্য সব করেছে, সেও এখন নিরুপায়। অর্পিতার খরচ বহন করা মামার পক্ষেও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অর্পিতার বাবা? সে কি নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। অর্পিতার কি অধিকার নেই, বাবার কাছ থেকে নিজের ভরণপোষণ পাওয়ার? এই সমাজ, এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা কি অর্পিতাকে তার মৌলিক অধিকার পাইয়ে দেবে না? নাকি এখানেই থেমে যাবে অদম্য এক মেধাবীর গল্প? এখানেই থেমে যাব অর্পিতার জীবন সংগ্রাম?

নিউজনাউ/এমএএন/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...