শরীয়তপুরে বন্যার পানি কমলেও বেড়েছে নদী ভাঙন

কে এম রায়হান কবীর, শরীয়তপুর প্রতিনিধি:
শরীয়তপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। পদ্মা নদীর পানি সুরেশ্বর পয়েন্টে কমতে শুরু করেছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। বন্যার পানিতে ৪টি উপজেলায় ২ লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, স্কুল কলেজে পানি ঢুকে পড়েছে। হাঁটু ও কোমর পানিতে ডুবে গেছে রাস্তা ঘাট। পাশাপাশি বন্যার পানি কমতে থাকায় জাজিরা উপজেলায় নদী ভাঙন তীব্রতর হচ্ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

ঊড়কান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম সরদার, জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ শাখা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। পদ্মা নদীর পানি সুরেশ্বর পয়েন্টে কমতে শুরু করেছে। ১৭ সেন্টিমিটার কমে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩ সে: মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার পানি কমতে থাকলে ও বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বরং দুর্ভোগ আরো বেড়েই চলছে। বন্যা দুর্গত জাজিরা, নড়িয়া ,ভেদরগঞ্জ ও শরীয়তপুর সদর উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নে ২ লক্ষাধিক পরিবার খাবার পানীয় জল ও পয়ঃনিস্কাশন সংকটে রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ শাখা প্রধান সহকারী রকিব হোসেন নিউজনাউকে জানান, ৪টি পৌরসভা এলাকার বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। ৪টি উপজেলার ১৪টি হাইস্কুল ১টি কলেজ, ২৪৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। সেখানে ২৯৮টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ঘরে থাকতে না পেরে ১ হাজার ১৩৪ জন মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুর রব নিউজনাউকে জানান, বন্যার পানিতে জেলার প্রায় ৪ শতাধিক মৎস্যচাষীর পাঁচ শতাধিক মাছের পুকুর ও ঘের ভেসে গেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা। বানের পানিতে জেলার ৪টি উপজেলার কমপক্ষে পাঁচ হাজার হেক্টর জমির আমন বীজতলা, রোপা আমন, আউশ, বোনা আমন, পাটমেসতা, শাকসবজি, আখ ও পানের বরজ ফসল বিনষ্ট হয়েছে বলে জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মো. আমির হামজা জানান।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১০ কিলোমিটার রাস্তা ডুবে গিয়ে শরীয়তপুর-মাঝিরঘাট, শরীয়তপুর-কাঠালবাড়ি মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এলজিইডির আঞ্চলিক সড়কসহ গ্রামীণ পাকা সড়ক প্লাবিত হয়েছে ৩শ’ কিঃমিঃ কাচা রাস্তা বিনষ্ট হয়েছে ৪শ’ কিঃমিঃ। এরপরে মরার উপর খরার ঘা। গৃহহীন মানুষ কোথাও রাস্তার পাশে উঁচু জমিতে অন্যত্র খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

কুন্ডেরচর ইউনিয়নের মেম্বার আলাউদ্দিন ফকির নিউজনাউকে জানান, বানভাসি দুর্গত মানুষ গবাদি পশু হাস মুরগী নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। বন্যার পানিতে নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট ও বন্যার পানিতে পয়ঃনিস্কাশনের জায়গা তলিয়ে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন বানভাসিরা।

বড়কান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম সরদার নিউজনাউকে বলেন, বন্যার পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে নদী ভাঙন তীব্রতর আকার ধারণ করেছে। ভাঙন কবলিত এলাকার অসহায় গৃহহীন মানুষ রাস্তায় ও আশেপাশের অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমির হামজা নিউজনাউকে বলেন, ‘বন্যার পানিতে ৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়েছে। এ ক্ষতি কৃষকের কাটিয়ে তুলতে অনেক কষ্ট হবে। তাই বন্যার পানি কমে গেলে সরকারি সহায়তার জন্য আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান নিউজনাউকে বলেন, বন্যার পানিতে শরীয়তপুরের কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার রাস্তা ডুবে যাওয়ার ফলে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। ঐসব রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান ফরাজি বলেন, ‘বানের পানিতে জেলার ৪টি উপজেলার প্রায় ৮ কিঃমিঃ কাচা পাকা রাস্তা বিনষ্ট হয়েছে। পানি সরে গেলে আমরা সংস্কারের উদ্যোগ নিব।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘৪টি উপজেলার ২৪৪টি বিদ্যালয় বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। দুটি বিদ্যালয় নদী ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ৯টি বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রে বানভাসিরা আশ্রয় নিয়েছেন। আমার কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষকগণ সার্বক্ষণিক তদারকি করছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান হাবিবুর রহমান বলেন, পদ্মানদীর পানি কমতে শুরু করেছে তবে ভাঙন শুরু হয়েছে। সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মারপানি ১৭ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৩ সে: মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভাঙন কবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে কাজ চলছে।

নিউজনাউ/এবি/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...