যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব-সর্বস্বান্ত নদীপাড়ের মানুষ

হারুন অর রশিদ খান হাসান, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জে প্রমত্তা যমুনা নদীর পানি বেড়েই চলেছে। প্রবলবেগে বইছে বিপৎসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে।

যমুনার অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি ও প্রবলস্রোতে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের শিমলা পাঁচঠাকুরীর মাটির অংশসহ কংক্রিটের পুরোটাই নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার সাথে সাথে ভয়াবহ ভাঙনে মুহূর্তের মধ্যে পাঁচঠাকুরী পাঁচপাড়া গ্রামের দুই শতাধিক বাড়ি ঘর,জমিজমা,গাছাপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

ভাঙন আতঙ্কে আশপাশের আরো কয়েকটি গ্রামের সহস্রাধিক বাড়ি ঘরের মানুষেরা। ভয়াবহ নদী ভাঙনে নিঃস্ব-সর্বস্বান্ত অসহায় মানুষদের অশ্রুজল বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুর থেকে রবিবার (২৬ জুলাই) সকাল পর্যন্ত সদর উপজেলার সিমলা ও পাঁচঠাকুরি এলাকার প্রায় ৭০ মিটার বাধ গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি ও অবহেলার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী।

ভাঙন কবলিতরা অভিযোগ করে বলেন, সঠিক রক্ষনা-বেক্ষনের অভাবে সিমলা-পাঁচঠাকুরী স্পারে ১ জুন ধ্বস নামে। প্রায় ৭০ মিটার এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বালির বস্তা ফেলে কোন রকমে বাঁধটি সংস্কার করা হলেও তিন সপ্তাহের মাথায় স্পারের মুল স্যাংকসহ অধিকাংশ এলাকা নদী গর্ভে চলে যায়। এর পর থেকেই মাঝে মাঝে এই এলাকায় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে থাকে একর পর এক বাড়ি ঘর ও স্থাপনা।

স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার দুপুরে হঠাৎ করে শুরু হয় ভয়াবহ ভাঙন। রবিবার (২৬ জুলাই) সকাল পর্যন্ত দুই শতাধিক বাড়ি-ঘর, মসজিদ, আসবাবপত্র, গবাদি পশু, ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

এ সময় ভাঙন কবলিতদের আহাজারি ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না। ঘড়বাড়ি রেখে জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছেন অনেকে। ভাঙন আতংকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে অনেকে। যমুনার আকস্মিক ভাঙনে সহায় সম্বল আর মাথাগোজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে অসহায় মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের খোলা আকাশেরে নিচে, এ যেনো এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। এমন তীব্র ভাঙন এর আগে কখনো দেখেনি।

ছোনগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল আলম জানান, সিমলা এলাকায় ব্যাপক নদীভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুদিনে শতাধিক ঘরবাড়ি, মসজিদ, ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, সিমলা স্পার বাঁধটি নদীতে বিলীন হওয়ায় যমুনার গতি পরিবর্তন করে সরাসরি বাঁধে আঘাত করছে। এ কারণে হঠাৎ করেই ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করা হবে।

সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ নিউজনাউকে জানান, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের আপাতত নিরাপদ স্থানে রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

এই ঘটনায় শনিবার (২৫ জুলাই)রাত ৩টার সময় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেন।

পরে শনিবার (২৫ জুলাই) ১১ টার দিকে সিমলা এলাকায় পানিবন্দী মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরকার অসীম কুমার প্রমুখ।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহিম নিউজনাউকে জানান, জেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। ছয়টি উপজেলার প্রায় ২৫০ গ্রামের ৫৮ হাজারেরও বেশি পরিবারের তিন লাখ ৪০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে সাড়ে ৫৩ কিলোমিটার রাস্তা ও বাঁধ এবং ৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চারটি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এবং তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক। তলিয়ে গেছে ১৪ হাজার ১৩ হেক্টর জমির ফসল। এরই মধ্যে বন্যার্তদের জন্য ২৬৭ মেট্রিক টন চাল, ৩৯৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ছাড়াও শিশুখাদ্য ও গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য দুই লাখ টাকা করে মোট চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নিউজনাউ/এফএফ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...