মৃত্যুকালেও ছেলে হত্যার বিচারের দাবি করেন রতনের মা

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: স্বামী হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন রোজি বেগম। ছোট্ট দুটি সন্তান নিয়ে ভাইয়ের সহযোগিতায় জীবন কাটানো শুরু করেন। অল্প বয়সে দুটি সন্তান হারিয়েছে তাদের পিতা। এরপর থেকে কঠিন সংগ্রাম করেই জীবন অতিবাহিত করছে এই পরিবার। যাদের কথা বলছি সেই পরিবারটি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত রতন শিকাদারের পরিবার। যার মা মমতাজ বেগম নিজের মৃত্যুকালেও অবচেতন মনে ছেলের হত্যার বিচারের দাবি করেছেন।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার গাবতলী এলাকায় পরিবারের সাথে বসবাস করতেন রতন শিকদার। এ জেলাতেই তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি ছিল অসীম টান। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর এই টান আরও বাড়তে থাকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর দেশের জন্য বাবার মতো কাজ করবেন সেই আশায় বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থন শুরু করেন। প্রবল ইচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ তার কন্ঠে শোনার জন্য মঞ্চের কাছাকাছি পৌছে যেতেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সেই আগ্রহের বসেই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনের সমাবেশে মঞ্চের কাছে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনেন। তিনি প্রতিবার ভাষণ শুনে এসে নিজের পরিবারের সদস্যদের সেই গল্প শুনাতেন। কিন্তু সেদিন আর তেমনটি হয়নি। সেদিন ফিরে আসেননি রতন শিকাদার। পরদিন ২২ আগস্ট ফিরেছেন তবে জীবিত নন, লাশ হয়ে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শেষ করার পরেই হরকাতুল জিহাদের একদল জঙ্গি সেখানে গ্রেনেড হামলা করে। এ ভয়াল গ্রেনেড হামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। তাদের মধ্যেই একটি নাম রতন শিকদার।

রতন শিকাদারের ভাই টুটুল শিকদার ও তার স্ত্রী রোজি বেগমের সাথে কথা বলে জানা যায় ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলা ও তাদের পরিবারের না বলা কিছু কথা।

রতন শিকদারের ছোট ভাই টুটুল শিকদার ২১ আগস্ট স্মৃতি মনে করে বলেন, সেদিন সকালে আমার ভাই ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে ঢাকার জন্য রওনা হন। যাওয়ার পূর্বে তিনি জানতেন না প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশ আছে। তিনি তার কাজ শেষ করে ফেরার সময় সমাবেশের কথা জানতে পেরে সেখানে ছুটে যান। রাতে আমাদের একজন আত্মীয় আমাদেরকে জানায় গ্রেনেড হামলার সময় রতন ভাই সেখানে ছিল আর তিনি গুরুতর আহত হয়েছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

জেনেই ছুটে যাই হাসপাতালে। রাত ১১ টায় হাসপাতালে পৌছে যাই। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের ৩নং ওয়ার্ডের ৯নং বেডে ভাইকে খুঁজে পাই। দেখে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। ভাই আমার বেঁচে আছে। কারণ ভাইয়ের মাথায় ছাড়া দেহের কোথাও কোন আঘাতে চিহ্ন ছিল না। ভাইকে গিয়ে ডাক দিলাম, ভাই উঠল না। পাশের নার্স বলল ভাই আমার মারা গেছে।

ভাইয়ের মাথায় হাত দিয়ে আমি ভয়ে কেঁপে উঠি। মাথার পিছনের অংশাবিশেষ ছিল না। এরপর চুপ করে সেখানেই বসে পড়ি। ২ ঘন্টা পর রাত ১টায় ভাইয়ের লাশ ডোম ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। গিয়ে দেখি ২ বস্তায় শুধু কাটা হাত-পা। পরদিন দুপুরে লাশের পোস্টমোর্টেম হয়। সারাদিন আর লাশ দেয়নি। রাত ১২টায় ভাইয়ের লাশ দেয়। কাউকে লাশ দেখানোর পরিস্থিতি ছিলো না। রাত ৩ টায় দাফন করি ভাইকে।

রতন শিকাদারের মৃত্যু পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ভাই হারিয়ে একদিন শোক কাটাতে পারিনি। পরদিন থেকে বাড়িতে পুলিশ এসে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। নিজেকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে কুয়েত পালিয়ে যাই। ভাইয়ের মৃত্যুর মাত্র ১৫ মাস আগে আমার বাবা মারা যায়। যেসময় পুরো পরিবারের দায়িত্ব ছিল আমার উপর, সেই সময় বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে পালাই।

প্রথম সন্তান তাই যেন সব মায়ের কাছে বড্ড আদরের। এমনি আদরের সন্তান ছিলেন রতন শিকদার। মমতাজ বেগমের বড় সন্তান ছিলেন রতন শিকাদার। ছেলে হত্যার আসামিদের বিচার হয়নি এই আক্ষেপ নিয়ে মারা যান তিনি। দুই বছর আগে তিনি আক্ষেপ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পূর্বে চেয়েছিলেন ছেলে হত্যার আসামির বিচার হোক।

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...