বন্যা ও মানবিক বিপর্যয়ের অঞ্চল রংপুর

রংপুর ব্যুরো: রংপুরের আকাশে অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি। প্রবল বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। চারদিক অথই পানিতে তলিয়ে গেছে শহর-গ্রামের নিম্নাঞ্চল। গত ২৪ ঘন্টায় প্রায় ৩শ’ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে স্থানীয় আবহাওয়া অফিস। গত একমাস ধরে উজানের ঢলে এই অঞ্চলের পাঁচটি জেলার ২৫ উপজেলা পানিতে নিমজ্জিত। সড়ক, বাঁধ কিংবা আত্মিয়ের বাড়িতে অবস্থান করে মানুষ। নদী ভাঙন ও বানের জলে পরে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১৭ জন। এরই মধ্যে বানের পানিতে জলবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৫ লাখ মানুষ। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ক্ষতি হয়েছে সম্পদেরও। ভেসে গেছে বিভাগের ৫ হাজার পুকুরের মাছ। বিচ্ছিন্ন হয়েছে ২২ কিলোমিটার সড়ক ও বেশ কিছু ব্রীজের সংযোগ পথ।

আষাঢ় মাসে উত্তরের কৃষকের মনে জাগে নতুন আশা। জমিতে থাকে ফসল বোনার ধুম। কিন্তু এবারের দৃশ্যপট একেবারেই আলাদা। টানাবৃষ্টি আর উজানের অথই পানিতে ঢেকে যায় কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাগট ও করতোয়া আগ্রাসীরূপে স্থায়ী হয় বন্যা।

গেলো একমাস ধরে নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধার পাঁচ লাখ মানুষ বানের সাথে যুদ্ধ করছেন। তলিয়ে গেছে মাথা গোজার ঠাই, ফসলী জমি পুকুর-খাল-বিলসহ রাস্তা-ঘাট। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থাও। সবহারা মানুষগুলো এখন অনেকটাই দিশেহারা। ঘরের মেঝেতে হাঁটুপানি। চৌকি ডুবুডুবু করছে। বাইরেও একই অবস্থা। নৌকা, কলার ভেলা ছাড়া দাঁড়ানোর ডাঙা নেই। নেই উঁচু জায়গায় যাওয়ার সামর্থ্য। কলার ভেলায় রান্না, ঘুমানো, খাওয়াদাওয়া চলছে। ছাগল-ভেড়া রাখা হয়েছে চৌকিতে। মোরগ-মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরের চালে। বিশেষ করে এমন দৃশ্য চোখে পরবে কুড়িগ্রামের চিলমারি ও গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।

মঙ্গলবার সাতসকালে চিলমারী থেকে লোকাল ট্রেন ধরে রংপুর শহরে আসেন রাইয়াজুল, মনসুর আলী, কেরামত আলীসহ আরো বেশ কয়জন কাজের সন্ধানে। জানালেন তাদের কষ্টের গল্প। কলার ভেলায় সংসার পেতে কোনরকম টিকে আছেন। গত সপ্তাহে তাদের এক শিশু সন্তান নদীতে পরে মারা গেছে। হাড়িতে খাবার নেই, হাতে নেই টাকা। কিন্তু কোথাও কাজ যোগার করতে না পেরে খালি হাতে ফিরে যান বাড়িতে। বানের পানির যুদ্ধে টিকে থাকার সাহস ও সামর্থ দু’টোই হারিয়েছেন তারা। রংপুর বাস টার্মিনালে কথা হয় ফুলছড়ি থেকে আসা খাদেমুল হক, আফসার আলী ও মোর্শেদ মিয়ার সাথে। তাদের কষ্টের রঙ একটু আলাদা। যমুনা নদী অনেক আগেই সব সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। গত দুবছর ধরে চরে বসতি গড়ে তুলেছেন। রবি ফসল আবাদ করে সংসারের অভাব কিছুটা দূরে ঠেলেছেন। কষ্ট করে আমন লাগিয়েছিলেন জমিতে। এখন সব শেষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে স্থানীয় বাঁধে আশ্রয় নিলেও অনাহারে বেশিরভাগ দিন পার করেছেন তারা। ছোট সন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবার ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে খাদ্যের সন্ধানে ছুটে এসেছেন এই শহরে।

ওপারের পানি যেমন ক্ষতি করেছে মানুষের সহায় সম্বলের। তেমনি বড় ক্ষতি হয়েছে এই অঞ্চলের মৎস্যশিল্পে। মাছ চাষে স্বয়ংসম্পন্নতা অর্জন করা এই স্থায়ী বন্যায় বিভাগের চার হাজার ১শ’ মৎস্যচাষীর ৭শ’ ৬৭ হেক্টরজুড়ে থাকা ৫ হাজার পুকুরের ১৪শ’ কোটি টাকা মূল্যের মাছ জলে গেছে। যদিও ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার কথা জানালেন বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাইনার আলম। আরও জানালেন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে না পারলেও বাৎসরিক উৎপাদনে মাছের ঘাটতি পূরণ করতে হবে বিভিন্ন এলাকার মাছ আমদানী করে।

এছাড়া ভারীবৃষ্টিতে জাতীয় সড়কের ৬০ কিলোমিটার এলাকা হয়েছে ক্ষতবিক্ষত। বানের পানিতে ডুবেছে ১৪ কিলোমিটার সড়ক। অতিবৃষ্টির কারণে দ্রুত সময়ে এসব সড়ক সংস্কার কাজ করা সম্ভব হচ্ছেনা বলে জানালেন সড়ক ও জনপদ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান। আর চলাচলের উপযোগিতা হারিয়েছে এলজিইডির ১০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক। ভেঙেছে ৮টি ব্রীজের সংযোগ পথ। যদিও এসব সংস্কার কাজে বাঁধ সেধেছে বৃষ্টি বলে দাবি করলেন, এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন দিক থেকে সফলতায় বিশেষত উন্নয়নে এই উর্বর অঞ্চলটি একটি উদাহরণ। প্রতিবছরই দুর্যোগ নিয়মিতই হচ্ছে এবং সেগুলো মাত্রায় আরও ভয়াবহ। শুধুমাত্র কৃষির ওপর ভর করে এখানকার মানুষ তাদের জন্য একটি সুন্দর জীবন তৈরি করেছে। গ্রামের দরিদ্র মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য টাকা বিনিয়োগ করছে, শ্রম দিচ্ছে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন নিয়মিত, তখন তাদের নিরাপদ ঘরবাড়ি তৈরি, অর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা করার সময় এখনই। এজন্য সরকারকে আরো আন্তরিক হবার আহবান জানিয়েছেন তারা।

নিউজনাউ/এসএইচ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...