পুলিশ নিজেই কতটা নিরাপদ!

পার্থ প্রতীম নন্দী, চট্টগ্রাম ব্যুরো:
করোনা পুলিশ বাহিনীকে নতুন করে চিনিয়েছে একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। জীবন বাজি রেখে রাত-দিন মাঠে অদৃশ্য এক শত্রুর মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। জনগণকে করোনামুক্ত রাখতে যদিও তাদের এই লড়াইকে আরো কঠিন করে দিচ্ছে অভুক্ত-অবাধ্য বাঙালি! নিজেদের কর্মপরিধির বাইরে গিয়ে হেন কোনো কাজ নেই যা পুলিশ বাহিনী করেনি।

পুলিশের এই মানবিক কিংবা নব উদ্যমের মডেল বলা যেতে পারে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশকে (সিএমপি)। করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারি ঘোষণার আগেই সিএমপি বন্ধ ঘোষণা করেছিল পর্যটনস্পট, হোটেল-মোটেলসহ সকল সামাজিক অনুষ্ঠান। শুরু থেকেই নমনীয় হয়ে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা কিংবা জনগণকে ঘরে ফেরানো, রাস্তায় জীবাণুনাশক পানি ছিটানো, শ্রমজীবী মানুষদের সহায়তা করা, ডাক্তার রোগীদের হাসপাতাল পৌঁছে দেওয়া, কোয়ারেন্টিনে যারা রয়েছেন, তাদের ফলফুল আর সনদ দেওয়া, ডোর টু ডোর শপ চালু করা, কিংবা সর্বশেষ খোলা জায়গায় বাজার স্থানান্তর করে করোনা মোকাবেলা করছে তারা।

তবে করোনা তো চোর, পুলিশ, ডাক্তার কিংবা সাধারণ জনতা চেনেনা। সে মত্ত ‘যাকে পাবি তাকে ছোঁ’ খেলায়। মহামারী এই ভাইরাস মোকাবেলায় অন্যতম যোদ্ধা সিএমপির ছয় সদস্যসহ আরেক সদস্যের স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত। এই ছয়জনের পাঁচজন ছিলেন আবার ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বে। এখন প্রশ্ন কিংবা জিজ্ঞাসা হল, পুলিশ নিজেই আসলে কতটা নিরাপদ!

ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরাই কেন আক্রান্ত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মনে হতেই পারে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন! তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন ব্যাপারটা হয়তো তেমন নয়। এদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাদের আবাস্থল পুলিশি ব্যারাক থেকেই। গাদাগাদি করে থাকতে গিয়ে আরো বেশি আক্রান্ত হতে পারেন এমন সম্ভাবনা থেকে বাড়ানো হয়েছে ব্যারাকের সংখ্যা। নগরের জিইসি কনভেনশন সেন্টারসহ নির্ধারণ করা হয়েছে আরো কয়েকটি হোটেল। তাই সচেতনতা বাড়িয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জোর দিয়েছেন সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এদিকে চট্টগ্রামে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে প্রথম করোনা শনাক্ত হন গত ১২ এপ্রিল। ১৪ দিনের মাথায় এসে এই সংখ্যা ঠেকে ৬ জনে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তারা সবাই সুস্থ আছেন। যদিও প্রথম আক্রান্ত সেই পুলিশ সদস্যের দ্বিতীয়বার নমুনা পরীক্ষায়ও পজেটিভ ফলাফল এসেছে।

নমুনার ফলাফল পেতে দেরি হওয়ায় পুলিশের মধ্যে আক্রান্ত সদস্য বাড়ছে বলে নিউজনাউকে জানিয়েছেন বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালের ডা. আহম্মেদ রসুল।

তিনি বলেন, ‘দেখুন যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে খুব বেশি লক্ষণ ছিল না। তারা একবারেই সুস্থ ছিল। সাসপেক্টেড হিসেবেই তাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেই নমুনার ফলাফল আমরা পাচ্ছি পাঁচ-সাতদিন পর। তাহলে এই কয়দিনে তারা নিজেদের অজান্তে অন্যদের মধ্যে এই রোগ ছড়াচ্ছেন। গত একসপ্তাহে বিশ বাইশ জনের মতো পুলিশ সদস্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে যার মধ্যে তিন-চারজনের ফলাফল পাওয়া গেছে। দ্রুত রিপোর্ট পাওয়া গেলে তাদের চিকিৎসাসহ আইসোলেশনে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হত বলে তিনি মত দেন। তবে তাদের পক্ষ থেকে পুলিশ সদস্যদের সকল রকমের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য নির্দেশনা বার বার দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সিএমপির ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ নিউজনাউকে বলেন, ‘ট্রাফিক সদস্যরা মানুষের সংস্পর্শে বেশি আসেন৷ তাই তাদের ঝুঁকিটাও বেশি। তবে আমাদের যে ৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন তাদের সবাই যে মাঠে কাজ করতে গিয়ে সংক্রামিত হয়েছেন তাও কিন্তু না। আক্রান্ত পাঁচ জনই একই ব্যারাকের একই রুমের। প্রথমজন বাইরে থেকে সংক্রামিত হয়েছে বাকিরা সবাই তার দ্বারা হয়তো সংক্রমিত হয়েছে।’

সার্বিক এই পরিস্থিতিতে বা আরো আক্রান্ত হলে সিএমপির সদস্যরা মনোবল হারাবেন কিনা জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার মো. মাহবুবুর রহমান নিউজনাউকে বলেন, ‘যেকোন দৈব-দুর্বিপাকে ঝুঁকির মধ্যে লড়াই করায় আমাদের কাজ। মনোবল ভাঙার প্রশ্নই আসে না। আমাদের ফোর্সরা একেবারেই প্রান্তিক লাইনে কাজ করছেন তাই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবেই। তবে মাঠে দায়িত্ব পালন করা সকলকে হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্কসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী দেয়া হয়েছে। পিপিই পরে তো আসলে বেশিক্ষণ কাজ করা যায় না, তাই সবাইকে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করেই কাজ করার বিষয়ে জোর দিচ্ছি আমরা৷’

পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিএমপির পক্ষ থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জিইসি কনভেনশন হলসহ কয়েকটি হোটেলে বেশকিছু পুলিশ সদস্যের থাকার ব্যবস্থা করা, কারো লক্ষণ দেখা দিলে তাকে সাথে সাথেই পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে ভর্তি করানো ছাড়াও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সচেতনতা বাড়ানো হয়েছে ব্যাপকভাবে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

নিউজনাউ/এসএইচ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...