দক্ষিণাঞ্চলে বিলুপ্তির পথে বাবুই পাখি

এম কে রানা, পটুয়াখালী প্রতিনিধি: বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালী। এ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কালের আবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে বড় বড় গাছে ঝুলে থাকা নিপুণ কারুকার্যে মোড়ানো বাসা তৈরির কারিগর বাবুই পাখি।

তাল গাছে, নারিকেল গাছে ও খেজুর গাছের পাতায় ঝুলে থাকা নিপুণ কারুকার্য খচিত পাখির বাসা দেখেই বোঝা যেত এটা বাবুই পাখির বাসা। দেখতে অনেকটাই চড়ুই পাখির মতো; কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণেই বাবুই পাখি অনেকটা বিলীন হতে চলেছে।

ঘন বসতি বাড়ায় এবং অপরিকল্পিতভাবে গাছ পালা কেটে ফেলা বিশেষ করে তাল গাছ, খেজুর গাছ অবৈধ ইট ভাটায় পোড়ানোর জন্য কাটার ফলে কমে আসছে বাবুই পাখির বসবাস। এতে বিপন্ন হচ্ছে এই শিল্পী পাখি বাবুই।

আজ থেকে প্রায় ১৪-১৫ বছর আগেও গ্রাম-গঞ্জের মাঠ-ঘাটের তাল গাছে দেখা যেত এদের বাসা। বাবুই পাখির বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই নয়, মানুষকে স্বাবলম্বী হতে উৎসাহিত করতো।

কবি রজনীকান্ত সেন লিখেছেন বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়েঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকার পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি-ঝড়ে।’

বাবুই পাখির বাসাগুলো যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি মজবুত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রবল ঝড়ে বাতাসের সাথে টিকে থাকতে হবে এমনটা মাথায় রেখে তারা বাসা তৈরি করে। বড় আশ্চর্যের বিষয় হলো আবহাওয়ার তারতম্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে বাসার ভিতরে থাকে বিভিন্ন বিভিন্ন স্তর। বাসার ভিতরে ঠিক মাঝ খানে একটি আড়া তৈরি করে থাকে। যেখানে পাশাপাশি দুটি পাখি বসে প্রেমালাপসহ নানা রকম গল্প করে। তারপর রাত্রি নিদ্রা যায় ঐ আড়াতেই।

আষাঢ় মাস আসতে না আসতে কিচিরমিচির শব্দে মাঠে প্রান্তরে উড়ে উড়ে খড়কুটো সংগ্রহ করে তালগাছে বাসা বাঁধে তারা। মূলত তালগাছে বাসা বাঁধতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বাবুই পাখি।

পুরুষ বাবুই পাখি এক মৌসুমে ছয়টি পর্যন্ত বাসা তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এরা ঘর-সংসার করতে পারে ছয় সঙ্গীর সাথে। তাতে স্ত্রী বাবুই ‘র কোন বাধা নেই।

প্রজনন প্রক্রিয়ায় স্ত্রী বাবুই ডিমে তা দেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা দেয় এবং তিন সপ্তাহ পর বাবুই বাচ্চা সহ উড়ে যায়। স্ত্রী বাবুই খাদ্য সংগ্রহ করে এনে বাচ্চাদের খাওয়ায়।

পটুয়াখালী জেলার দুমকি, বাউফল, দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে গেলেই দেখা যেত গাছে গাছে ঝুলে আছে শিল্পী পাখি বাবুইর বাসা। কিন্তু এখন বিভিন্ন এলাকা ঘুরেও এখন আর দেখা যায় না,। বাবুই পাখির নিখুঁত বুননে এ বাসা টেনেও ছেঁড়া কষ্টকর।

প্রতিটি তালগাছে ৫০ থেকে ৬০টি বাসা তৈরি করতে সময় লাগে ১০-১২ দিন। খড়, কুটা, তালপাতা, ঝাউ ও কাশবন ও লতা-পাতা দিয়ে বাবুই পাখি উঁচু তালগাছে বাসা বাঁধে। সেই বাসা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি অনেক মজবুত।

প্রবল ঝড়েও তাদের বাসা ভেঙে পড়ে না। পুরুষ বাবুই পাখি বাসা তৈরির পর সঙ্গী খুঁজতে যায় অন্য বাসায়। সঙ্গী পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুইকে সাথী বানানোর জন্য পুরুষ বাবুই নিজেকে আকর্ষণীয় করতে খাল, বিল ও ডোবার পানিতে গোসল করে গাছের ডালে ডালে নেচে বেড়ায়। চমৎকার বাসা বুনে বাস করায় এ পাখির পরিচিতি বিশ্বজোড়া।

প্রজনন সময় ছাড়া অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী বাবুই পাখির গায়ে পিঠে তামাটে কালো বর্ণের দাগ হয়। নিচের দিকে কোন দাগ থাকে না। তবে প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির রং হয় গাড় বাদামি। অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী বাবুই পাখির পিঠের পালকের মতই বাদামি হয়।

বাউফল উপজেলার বগা ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের ধীরেন দাস (৬০) বলেন, আমাদের গ্রামে ছোটবেলা থেকে দেখছি রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাল,খেজুর সহ বড় বড় গাছগুলোর ডালের সাথে ঝুলে থাকতো অনেক বাবুই পাখির বাসা।

বিকেল হলেই তাদের কিচির মিচিরের শব্দ বেড়ে যত। কিন্তু এখন বাবুই পাখির বাসা আর দেখা যায় না। জমিতে কীটনাশক ব্যাবহার,বড় বড় গাছ কেটে ফেলা সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে বাবুই পাখিটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। কৃষক জমিতে কীটনাশক ব্যাবহার করায় এমন অনেক পাখি খাদ্যের অভাবে হারিয়ে যাবে।

তবে পাখি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বাবুই পাখি একাধারে শিল্পী, স্থপতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। তাদের মতে, বাবুই পাখি খাবারের জন্য ঝাঁক বেধে চলতে ভালোবাসে। প্রতিটি বাবুই পাখির ওজন ১০০-১৫০ গ্রাম। এক দিকে বাবুই পাখি শিকার অন্যদিকে তালগাছ ও খেজুরগাছ বিলুপ্তির কারণে বিলুপ্ত হচ্ছে বাবুই পাখি । এ কারিগর পাখিকে বিলুপ্তির পথ থেকে রক্ষা করতে মানব সমাজকে সচেতন হতে হবে।

নিউজনাউ/এফএফ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
Loading...