টিউশনহারাদের পাশে মানবিক হিসাববিজ্ঞান

পার্থ প্রতীম নন্দী, চট্টগ্রাম ব্যুরো:

চট্টগ্রাম নগরের নালাপাড়ার মেসে ভাড়ায় থাকেন সুমন (ছদ্মনাম)। চট্টগ্রাম সরকারী সিটি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এই ছাত্র পাঁচটা টিউশন করে মাস শেষে পেতেন প্রায় পনের হাজার টাকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সুমনের সেই টাকায় চলত তার গ্রামের বাড়ির মা, বোন আর নিজের যাবতীয় খরচ। কিন্তু করোনা তার সেই আয়ের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।

মুখে মাস্ক লাগিয়ে এই বিশদিনে দুইবার ত্রাণ নিয়েছে সে দুইটা ভিন্ন জায়গা থেকে। কিন্তু গাড়ি না থাকায় সেই ত্রাণ সামগ্রী বাড়িতে পাঠাতে পারছে না। চাল, নুন, তেল ফুরিয়ে আসায় বাড়ি থেকে মা ফোন করে বলছে মোবাইলে বিকাশ করতে।

লজ্জায় মাথা নিচু করে প্রতিবেদকে করোনায় আক্রান্ত না হয়েও করোনার কাছে হেরে যাওয়ার বর্ণনা দিচ্ছিলেন ‘বিদ্যা সমবায়’ করে পেট চালানো সুমন!

সুমনের মতোই এমন আরো অনেক ছাত্র আছেন যারা জীবন নির্বাহ করত শুধু টিউশনের বেতনের টাকায়। করোনার ভয়ে মার্চ মাস থেকেই বন্ধ টিউশনে যাওয়া। আবার মধ্যবিত্ত মানসিকতা আর যুবক বয়স হওয়ায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ নেওয়ার সাহসও করতে পারছেন না তারা। এক দুর্বিষহ জীবন পার করছেন ‘ এমন হাজার হাজার ছাত্র।

এরমধ্যে একদিন সুমন প্রতিবেদকে কল করে। সুমনের কণ্ঠে স্বস্তির সুর। সে জানালো, ভাই কিছু টাকা পেয়েছি। সেগুলো মাকে বিকাশ করেছি। তার বিভাগের কিছু ছাত্র মিলে এই টাকা দিয়েছে। তার মতো যারা শুধু টিউশন করেই চলত তাদের  অনেকেই তারা টাকা দিচ্ছে।

করোনা আমাদের শারীরিক দূরত্ব হয়তো বাড়িয়েছে কিন্তু সামাজিক দায়বোধ শিখিয়েছে। সামাজিক দায়িত্ব  নিয়ে মানুষের পাশে এগিয়ে আসার অনেক চিত্র দেখেছি। তবে টিউশন বন্ধ এমন ছাত্রদের পাশে দাড়াতে দেখলাম এই প্রথম! খোঁজ নিলাম কারা এর উদ্যোক্তা। জানা গেল ‘মানবিকতায় হিসাববিজ্ঞান’ নামে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম সরকারী সিটি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ।

টিউশন হারানো শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে মানবিকতার তাড়নায় বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী একটি তহবিল গঠন করে সেখান হতে বিভাগীয় শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সহযোগিতা প্রদানের উদ্যোগ নেয়। এইকাজে তাদের মিলনস্থল হল বিভাগের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ফেইসবুক গ্রুপ “Accounting Family,Govt City College, Chattogram”।

উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল,  প্রথমে সবার কাছে তহবিল গঠনে অনুদান পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়। এই বিষয়ে তারা বিভাগের শিক্ষকদেরও সহযোগিতা প্রার্থনা করে। বিভাগের শিক্ষক এবং বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে তহবিল।

শিক্ষক আবু নাছির ভুইয়ান নিউজনাউকে বলেন, এই চরম সংকটে সবাই যখন বিপর্যস্ত তখন শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগ আমাদের সত্যিই অনেক আশান্বিত এবং গর্বিত করেছে। আমাদের সেসব মানবিক শিক্ষার্থীদের অনুরোধের প্রেক্ষিতেই প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে আমাদের সহকর্মী মিজান স্যার প্রকল্পটিতে সার্বক্ষণিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। আমি বিভাগের বর্তমান ও প্রাক্তন সকল শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগটিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাই।

‘আমাদের বিভাগের সকল শিক্ষার্থী যারা এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তাদের আমরা এই আশ্বাস দিতে চাই যে সবার অংশগ্রহণে যে তহবিল গঠিত হয়েছে তার ওপর অধিকার আপনাদের সবচেয়ে বেশি। আপনাদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকবে, আপনারা নিঃসংকোচে আমাদের বা সারদের জানান। আমরা সাধ্যমত আপনাদের পাশে থাকবো।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজনাউকে এইসব বলেছেন উদ্যোক্তাদের একজন।

তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগটি তারা পবিত্র রমজানের শেষ পর্যন্ত চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশা করছেন। তবে এই বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে সকলের সহযোগিতার উপর। সবাই যত বেশি অনুদান দিবেন তত বেশি শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা সম্ভব হবে।

নিউজনাউ/এফএফ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...