ক্ষুধার্ত পাগলের জন্য ভালোবাসা

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান প্রতিনিধি:

অজানা আতঙ্কে আজ থমকে গেছে গোটা বিশ্ব। করোনা ভাইরাস যুদ্ধে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। পরিবার পরিজনের বাহিরে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়েও ভাবনার সময় নেই কারো।

কিন্তু ফুটপাতে শুয়ে থাকা, দিকবেদিক ছুটে চলা মানসিক, শারীরিক, ভারসাম্যহীন মানুষগুলো পড়েছে বিপাকে।

খাবারের রেস্টুরেন্ট গুলো বন্ধ থাকায় রেস্টুরেন্ট গুলোর ফেলে দেয়া ময়লা আবর্জনা থেকে খাবার কুড়িয়েও খেতে পারছেনা। খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় নিয়মিত দু’একজন ভারসাম্যহীন মানুষদের যারা খেতে দিত, সেটিও আর হচ্ছেনা। লকডাউনে ক্ষুধার্ত মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষগুলোয় যেন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছিল।

কিন্তু অন্ধকারের মাঝেও আলোক রশ্মি পথ দেখায় ঠিকই। তেমনি করোনা যুদ্ধের সংকটকালীন সময়েও মানসিক ভারসাম্যহীন পাগলদের দুঃখ দুর্দশা চোখ এড়িয়ে যায়নি মানবপ্রেমী রাজেশ দাসের। তার অনুপ্রেরণায় তারই ছোটভাই শিমুল দাস’সহ ক’জন যুবক দিনরাত্রি খুঁজে খুঁজে মানসিক ভারসাম্যহীন পাগলদের হাতে খাবার, পানি বোতল, টিস্যু পৌঁছে দিচ্ছে নিয়মিত।

পাগলের জন্য মনের মধ্যে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকা মানুষটির নজরে আসে  বিষয়টি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার রান্না করে পাগলদের হাতে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেন মানবপ্রেমী রাজেশ দাস। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন ছোট ভাই শিমুল দাসের সঙ্গে। দুজনের প্রচেষ্টায় পাগলের জন্য ভালোবাসা খাবার, পানি শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের খুঁজে খুঁজে হাতে পৌঁছে দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছেন তারা। লকডাউনের পর ২৮ মার্চ থেকে কাজটি চলমান রয়েছে। বান্দরবান শহরের বিভিন্ন স্থানে ৩০ জনের মত ভারসাম্যহীন মানুষ রয়েছে। তবে প্রতিদিন সবাই’কে খুঁজে পাওয়া যায়না। ত্রিশ জনের খাবার প্যাকেট তৈরি করলেও প্রতিদিনই ৪/৫ জন নিখোঁজ থাকে। একজন’কে পাওয়া গেলে পরেরদিন আরেকজন’কে পাওয়া যায়না। নিয়মিত ২৪/২৫ জন পাওয়া যায়। বাকি প্যাকেট গুলো ক্ষুধার্ত কুকুর এবং শহরের দরিদ্র প্রতিবন্ধী ২ জনকে দেয়া হয়।

মানবপ্রেমী শিমুল দাস বলেন, বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় সমাজের মানুষিক ভারসাম্যহীন পাগল মানুষগুলোর খাবার, পানির বোতল,টিস্যু পেপার প্যাকেট করে হাতে হাতে পৌঁছে দেয়ার কাজ করছি। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজটি শুরু করেছিলাম। কিন্তু চলমান কর্মযজ্ঞে অনেকে অর্থ দিয়েছেন।

আবার অনেকে রান্না করে খাবার সরবরাহ করছেন। সঙ্গে খাবার পানির বোতলও দেয়া হচ্ছে।  বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন অনেক মানুষ। কাজটি করতে পেরে ভালো লাগে। মনের মধ্যে এক ধরণের প্রশান্তি অনুভব করি।

কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের কাজ হচ্ছে ওদের (পাগলদের) খুঁজে পাওয়া। ওরাতো একি জায়গায় সবসময় থাকেন না। মোটর সাইকেল নিয়ে শহরের মেঘলা, বালাঘাটা, কালাঘাটা, নতুনব্রীজ, পুরনোব্রীজ, বাসষ্ট্যান্ড, হাফেজঘোনা বিভিন্ন স্থানে খুঁজে খুঁজে খাবার পৌঁছে দিতে হয়।

শুধু প্যাকেট দিলেই হয়না। প্যাকেট খুলে খাইয়েও দিতে হয় অনেককে। মাঝে মাঝে ওদের আবদারও মেটাতে হয়। এই কাজে আমার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী আরও ৮ জন নিরলস ভাবে নিজস্বার্থে কাজটুকু করে যাচ্ছেন। অন্যরা হলো মোবিনুল ইসলাম জিকু, জিয়াউদ্দিন বাবলু, ইমরান উদ্দিন বাবু, মোঃ আইয়ুব, জাহেদুল ইসলাম, রিফাত মির্জা, রিজভী রাহাত, আল-আমিন।

উদ্যোক্তা মানবপ্রেমী রাজেশ দাস বলেন, অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাড়াতে আমার ভালো লাগে। দরিদ্র, অসহায়, ভারসাম্যহীন মানুষগুলোর জন্য আমার মন কান্দে। ছোট বেলা থেকেই এই কাজটি আমি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অর্থনৈতিক ভাবে নিজেও উচ্চবিত্ত কোনো পরিবারের সন্তান নয়। তারপরও ভালোবেসে সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায়, দরিদ্র, ভারসাম্যহীন ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত মানুষগুলোর পাশে দাড়াতে চেষ্টা করি। এই কাজে আমি অনেক বেশি তৃপ্তি পায়। যেখানে যা প্রয়োজন সহযোগিতা করা হচ্ছে। সকলের সম্মলিত প্রচেষ্টায় আমরা ক্রান্তিকাল কাটিয়ে উঠবো।

নিউজনাউ/এফএফ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
Loading...