ক্রেতা সংকটে পশু নিয়ে বিপাকে কুষ্টিয়ার খামারিরা

এ.এইচ.এম.আরিফ, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:
দেশে পশুর চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রেখে আসছে কুষ্টিয়া অঞ্চলের খামারি ও কৃষকরা। এবার কুরবানির ঈদকে টার্গেট করে জেলার ১৮ হাজার খামারি উৎপাদন করেছে এক লাখের বেশি গরু। এছাড়া ৬০ হাজার ছাগল পালন করেছে এখানকার খামারিরা। করোনা মহামারিতে এতো পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। প্রতিদিন হাট-বাজারে হাজার হাজার পশু বিক্রির জন্য নিয়ে এসে ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছেন না কৃষকরা। ক্রেতা না থাকায় কমতে শুরু করেছে সব ধরণের পশুর দাম। সবমিলিয়ে প্রায় দুই লাখ পশু উৎপাদন করে বড় লোকসানের মুখে পড়েছে দেশের সবচেয়ে বড় পশুর মোকামের খামারিরা। লাভ নয় গরু বিক্রি করে আসল তোলায় এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ।

কুমারখালী উপজেলার যদুবয়বা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের খামারি হান্নান মোল্লা। সারা বছর বাড়িতে কমবেশি গরু পালন করেন। ঈদ সামনে লাভের আশায় গরুর সংখ্যা বাড়ান। এবারো তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ৬টি গরু রয়েছে। দিন-রাত গরু পরিচর্যায় সময় পার করছেন। তবে ঈদ যত এগিয়ে আসছে তার চিন্তা তত বাড়ছে। দেশে করোনার এই পরিস্থিতি লাভের আশাতো দুরে থাক বাজারে নিয়ে গরু বিক্রি করে আসল তুলতে পারবেন কি-না এটা তার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

হান্নানের মত বেশির ভাগ খামারির গরু বিক্রি করা নিয়ে এখন থেকে নানা চিন্তা শুরু করেছেন। তবে কম লাভ হলেও অনেক খামারি স্থানীয় বাজারে আগেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।

জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্র শ্রেণির মানুষরা গরু লালন পালন করে থাকেন। এসব পরিবারগুলো তাদের বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন খামার। সব খামারেই দেশি ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু পালন করা হয়। তারা স্বপ্ন দেখেন সারা বছর লালন করা গরু বিক্রি করে কিছুটা স্বাবলম্বী হবেন। বিশেষ করে রিকশা, ভ্যান, অটোচালক কিংবা দিনমজুর নানা পন্থায় কিছু টাকা জমিয়ে অথবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ছোট ছোট গরু কিনে লালন পালন করেন। কিন্তু করোনা মহামারিতে গরুর দাম না পেয়ে দিশেহারা তারা। এমন পরিস্থিতিতে মোটা অংকের লোকসানে পড়তে যাচ্ছে জেলার খামারিরা।

খামারিরা জানান, প্রতি কুরবানির ঈদের দুই-একমাস আগে থেকেই হাটে হাটে ঘুরে ব্যাপারীরা গরু কিনে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যেত। এবার সেই সংখ্যা অনেক কম। জেলায় বড় পশুর হাট রয়েছে ১২টি। এসব হাট ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরো ছোট ছোট হাট-বাজারে বিক্রির জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার গরু-ছাগল নিয়ে আসছে খামারিরা। কিন্তু কেনাবেচা একদম কম। ঈদুল আজহার আর মাত্র ১৯ দিন বাঁকি থাকলেও বাইরের ব্যাপারীদেরও দেখা মিলছে না।

জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস মনে করছেন এবার ৫০ ভাগ গরু অবিক্রীত থাকতে পারে। আর যারা বিক্রি করতে পারবেন তারাও লাভ করতে পারবেন না খুব একটা। এতে খামারিরা বড় লোকসানে পড়ে যাবেন। এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই আগামী কয়েক বছর লোকসানে থাকবেন। কারণ যারা গো-খাদ্য বিক্রি করেন তারাও কুরবানির জন্য অপেক্ষা করেন। গরু বিক্রি করে দেনা শোধ করেন অনেকে। তাই তাদের বড় অর্থ খামারিদের কাছে পাওনা থেকে যাবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, কুষ্টিয়ার ৬ উপজেলায় ১৮ হাজার ২৩৩টি খামারে এবার ৭০ হাজার ৭৭টি গরু, বলদ ও গাভী ২০ হাজার ও ৫৯ হাজার ১৮৪টি ছাগল উৎপাদন করেছেন খামারিরা। গত বছর ৬৫ হাজার ৭১৩টি গরু ও ৬০ হাজার ছাগল উৎপাদন করলেও এবার উৎপাদন আরো বেড়েছে।

কুমারখালী উপজেলার সদকী ইউনিয়নের দরবেশপুর গ্রামের খামার মালিক সোহেল রানা নিউজনাউকে জানান, গত বছর সাত লক্ষ টাকা লোকসান হয়েছে। এতটাকা বিনিয়োগ করে যদি ভালো দাম না পায় তাহলে খামারিদের দুঃখের সীমা থাকবে না। করোনার কারণে গরু বাজারে নিয়ে বিক্রি করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তিনি। তাই বাড়ির ওপর থেকে বা স্থানীয়ভাবে কম লাভ হলেও গরু ছেড়ে দিবেন বলে জানান। তার খামারে ৫টির মত বড় গরু রয়েছে।

আজাহার আলী নামের একজন গরু ব্যবসায়ী বলেন, গরুর বাজার কম। কুরবানির আগে দাম বাড়বে বলে মনে হয় না। মানুষের হাতে টাকা নেই। তাই কুরবানির সংখ্যা এবার কম হবে। বেশির ভাগ প্রান্তিক খামারি এবার লোকসানে পড়বেন। অনেকেই গরু বিক্রি করতে পারবেন না। যারা বিক্রি করতে পারবেন তারাও লাভ পাবেন কম।

সদর উপজেলার আরেক বড় খামারি সোনাইডাঙ্গা গ্রামের শরিফ হোসেন। তার খামারে ছোট বড় মিলিয়ে ৬০টি গরু রয়েছে। এ গরুর অর্ধেক বিক্রি করা নিয়ে তার টেনশন। লাভ নিয়ে ভাবছেন না। গরু বিক্রি করতে পাললেই তিন খুশি। কারণ খামারে গরু থেকে গেলে প্রতিদিন তার পিছনে ব্যয় আছে। তাতে লোকসান আরো বাড়বে। তাই খামার খালি করা নিয়েই ভাবছেন তিনি।

জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিদ্দীকুর রহমান নিউজনাউকে বলেন, জেলায় এবার প্রচুর গরু পালন করছেন খামারিরা। তবে ঈদ এগিয়ে আসায় তাদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জেলার সব খামার মালিকরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে গরু নিয়ে লাভ করতেন তারা এবার ক্ষতির মুখে পড়ে যেতে পারেন। কারণ জীবন আগে পরে জীবিকা। এই অবস্থায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে গরুর বাজার। স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা হলেও বাইরে থেকে ব্যাপারীরা এবার না আসায় চিন্তা বেড়েছে খামারিদের।

তিনি বলেন, ‘আমরা খামারিদের মনোবল বাড়াতে কাজ করছি। তাদের নানা ধরনের প্রণোদনা দিয়ে আসছি।’

নিউজনাউ/এবি/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...