স্যার আমাকে ক্ষমা করবেন

হাসনাইন খুরশেদ:

বাইকটা কার্জন হলের সামনে পার্ক করে এক লাফে নামলাম। কোন রকমে লক করেই ছুটলাম করিডোর ধরে। খুব তাড়া ছিলো।

অনেকটা দৌড়াচ্ছিলাম। বায়ে বাঁক নিতেই দেখি বিপরীত দিক থেকে আসা মানুষটা একদম সামনে। ধাক্কাটা এড়ানো গেলো না। তাঁর হাতের একগাদা বই ছিটকে পড়লো করিডোরে।

বেশ বিব্রত হয়ে পড়লাম। ‘স্যরি’ বলেই ফ্লোরে বসে পড়লাম। বইগুলো উঠাতে লাগলাম। ততক্ষণে ধাক্কা সামলে তিনি দাঁড়িয়ে দেখছেন আমাকে।

সব বই হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। চোখ তুলে এই প্রথম তাকালাম লোকটার দিকে। এবার আমার চমকে ওঠার পালা।

স্যার! স্যরি স্যার.. আমি খুব স্যরি।

তিনি হাত রাখলেন আমার কাঁধে। বললেন, ঠিক আছে ভাই।

চশমাটা ঠিকঠাক করলেন। বইগুলো তুলে নিলেন নিজের হাতে। একটা বইয়ের নির্দ্দিষ্ট পৃষ্ঠাটা বের করলেন। তারপর বিড়বিড় করে কি যেনো পড়তে পড়তে হাঁটতে লাগলেন।

চলে গেলেন বাঁকের ওপারে।

হুমায়ুন স্যারের সাথে সেই প্রথম দেখাটা আমার জন্য ছিলো খুব বিব্রতকর। তবে তিনি মনেও রাখেননি।

পরে যখন এনটিভি’তে কাজ করি, চ্যানেল২৪-এ কাজ করি, অনেক বার কথা হয়েছে। দেখা হয়েছে। প্রথম দিনের সেই ঘটনা মনে পড়েছে বার বার। মনে করিয়ে দিয়ে বলেছি, আমি খুব দু:খিত স্যার।

প্রতিবারই তিনি বলতেন, আমার তো মনেই নেই। বাদ দাও ভাই।

যতবার দেখা হয়েছে, আমি ডাকতাম ‘হুমায়ুন স্যার’। উত্তরে বরাবরই তিনি সম্বোধন করতেন ‘ভাই’।

ছাত্র-শিক্ষকের মতো নয়, হুমায়ুন স্যারের সাথে আমার সম্পর্কটা হয়ে উঠেছিলো ভাইয়ের মতো, বন্ধুর মতো। সম্পর্কটা গড়েই উঠেছিলো শিক্ষা জীবন শেষ হওয়ার বেশ পরে।

তখন ২০০৩ সাল। আমি এনটিভি গড়ছি। হুমায়ুন আহমেদের নাটক ছাড়া তো টিভি চালানো যায় না। সম্ভবই না। যোগাযোগ করলাম স্যারের সাথে।

তিনি তখন ঢাকাতেই। তাঁর ধানমন্ডির বাসায়। সেখানে ডাকলেন না। বললেন, নাটক নিয়ে কথা বলতে হলে নুহাশ পল্লীতে আসতে হবে।

দিনক্ষণ ঠিক করে দিয়ে বললেন, আসেন, তখন কথা বলবো।

হুমায়ুন স্যার তখন নুহাশ পল্লী গড়ে তুলছেন। আজকের মতোন এতো গুছিয়ে উঠেননি। রাস্তাটা তখনও তৈরি হয়নি।

সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। বের হতে ইচ্ছাই করছিলো না। কিন্তু কিছু তো করার নেই। যেতেই হবে। নইলে যদি বেঁকে বসেন।

সেই ভয়ে হুমায়ুন স্যারের ঠিক করে দেয়া দিনে নুহাশ পল্লীর দিকে ছুটলাম আমরা।

আমরা মানে আমি আর কামাল ভাই। এনটিভির অনুষ্ঠান প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ ভাই।

রাস্তার পাশে থেমে মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে চিনে নিলাম নুহাশ পল্লীর রাস্তা।

অল্প কিছু দূর যাবার পরই আমাদের মাইক্রোবাসের চাকা ডুবে গেলো কাঁদার গভীরে। ড্রাইভার চারপাশ দেখে বললো, সামনে অবস্থা অনেক খারাপ। গাড়ি যাবে না স্যার।

তখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। গাড়িতেই বসে আছি। কিভাবে যাবো বুঝতে পারছি না। যেতে তো হবেই। টিভি চালাতে হলে যেতেই হবে।

তিনি যে হুমায়ুন আহমেদ। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন হুমায়ুন আহমেদ।

জুতো-মোজা খুলে হাতে নিলাম। প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুর উপরে তুললাম। দু’জনেই নামলাম গাড়ি থেকে। এগুতে গিয়ে বুঝলাম, সম্ভব না।

পিচ্ছিল কাঁদায় পড়ে যেতে যেতে আমাকে ধরে বাঁচলেন কামাল ভাই। আমার অবস্থাও তথৈবচ।

ঠিক সেই সময় একটা লোক এসে হাজির। আমাদের দু’জনের হাতে দুটো ছাতা তুলে দিলেন। আর দু’জনের হাতে ধরিয়ে দিলেন গাছের বড় ডাল কেটে বানানো দু’টি লাঠি।

বললো, লাঠিতে ভর দিয়ে এগুতে হবে। নইলে পড়ে যাবেন। জানালো, হুমায়ুন স্যার পাঠিয়েছেন।

সেই লাঠিতে ভর রেখে ছাতা মাথায় পৌঁছে দেখি, হুমায়ূন স্যার বৃষ্টি ভিজে নুহাশ পল্লীর মূল গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের অপেক্ষায়।

আমার সাথে কামাল ভাইকে দেখে তিনি খুব লজ্জা পেলেন। খুব সম্মান করতেন তাকে। দু:খ প্রকাশ করে বললেন, আপনি আসবেন সেটা তো জানতাম না।

আমি চুপ করে রইলাম। সেই সময় কিছু বললাম না। পরে জানতে চাইলে মুচকি হাসলেন। সরাসরি কিছু বললেন না।

তবে যা বললেন, তার সারমর্ম এ রকম- তোমাকে তো টিভিতে রিপোর্টিং করতে দেখেছি। আদৌ নাটকের মর্যাদা বোঝ কিনা, সেটা তো আমাকে বুঝতে হবে। নইলে তোমাদের জন্য নাটক লিখবো আর বানাবো কেনো?

সেই দিন থেকেই হুমায়ুন স্যারের অনেক স্নেহ পেয়েছি। অবশ্য তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ, দেখা-সাক্ষাৎ সবই হতো কালেভদ্রে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া হতো না বললেই চলে। তবে সেই দেখা-সাক্ষাতে, কথাবার্তায় ছিলো অপরিসীম আন্তরিকতা।

হুমায়ুন স্যার আমাদের জন্য নাটক লিখেছেন। নাটক বানিয়েছেন। অফিসে এসে আমাদের সাথে দেখা করেছেন। তাঁর ধানমন্ডির বাসায় ডেকেছেন। যত্ন করে খাইয়েছেন কতো কিছু। মাঝে মাঝে ফোন করতেন তিনি।

এনটিভিতে যা প্রচার হতো, তাতে তাঁর পছন্দ-অপছন্দের কথাও জানাতেন। ফোন করে খোঁজ-খবর নিতেন কখনো কখনো।

নিউ ইয়র্ক থেকে শেষ যে বার এলেন, তখন তিনি খুব অসুস্থ। আমি তখন চ্যানেল২৪-এর নির্বাহী পরিচালক। এক বিকালে ফোন করলেন। বললেন, পরদিন ফিরে যাচ্ছেন আমেরিকায়।

একটু অবাক হলাম। এই অবস্থায় যাবার আগের দিন আমাকে ফোন করে জানাচ্ছেন। স্যার জানালেন, দু’টি কারণে ফোন করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, তিনি যে আমাকে বিশেষ স্নেহ করেন, সেটা বলা হয়নি কখনো। আর একটা অনুরোধও আছে।

তিনি বললেন, একটা ছেলে আমার সাথে কাজ করে। খুব ভালো ছেলে। ওকে তুমি একটা চাকরি দিও। আর … টাকার কম বেতন দিও না।

আমি হুমায়ুন আহমেদ স্যারকে কথা দিয়েছিলাম। সেই ছেলেটাকে যতোটা সম্ভব ভালো বেতনে সম্মানজনক একটা চাকরি দেবোই। সেই সুযোগও আমার ছিলো।

আমি চাকরিটা দিতে চেয়েছিলাম বলেই স্যারকে কথা দিয়েছিলাম।

স্যার বললেন, তিনি ওকে আমার সাথে দেখা করতে বলবেন। ওর চাকরি হয়ে গেছে, এটাও বলবেন।

আমি সায় দিলাম।

হুমায়ুন স্যার দেশে ফিরলেন সবাইকে কাঁদিয়ে। হাজারো মানুষের ভিড়ে সেই ছেলেটিকে খুঁজলাম। কোথাও দেখলাম না।

ছেলেটা আমার কাছে এলো সপ্তাহখানেক পর। জানতে চাইলো, কবে জয়েন করবে? বেতন কতো ঠিক করা হয়েছে?

আগেই কর্তৃপক্ষের সম্মতি নেয়া ছিলো। হুমায়ুন স্যারের ঠিক করে দেয়া বেতন আর পদবি। আমি ছেলেটাকে জানালাম। ও আরো বেশি চাইলো। আরো বড় পদবি, আরো বেশি বেতন।

বুঝিয়ে বললাম, যেহেতু আগে কখনো টিভিতে চাকরি করোনি, এর চেয়ে বেশি কিছু হলে সহকর্মীদের অস্বস্তি হবে। শুরু করো। পরে দেখা যাক।

প্রবল আপত্তির সাথে সে বললো, ওরা কি কেউ সিনেমা বানাতে পারবে? নাটক বানাতে পারবে?

আমি বললাম, তুমিও তো কখনো বানাওনি।

কি বলেন বানাইনি? গত ২/৩ বছরে স্যারের নামে যে সব নাটক-সিনেমা হয়েছে, তার বেশ কয়েকটি তো আমিই বানিয়েছি। স্যার তো শুধু স্ক্রীপ্ট লিখেছেন।

আমি চমকে উঠলাম। রাগে পায়ের রক্ত তখন মাথায় চড়ছে। অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছি।

ছেলেটা বলেই চলেছে, এটা আমার বানানো.. ওটা আমার বানানো.. শুধু নাম গেছে স্যারের..।

প্রিয় হুমায়ুন আহমেদ স্যার, আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনার অনুরোধটা আমি রাখিনি। আপনাকে কথা দিয়েও আমি সেই কথা রাখিনি।

স্যার, ছেলেটাকে আমি চাকরি দেইনি। অফিস থেকে বের করে দিয়েছিলাম। সেই ছেলেটার খোঁজ রাখিনি আর।

আজ চারপাশে তাকিয়ে দেখি, ওরাই এখন গণমাধ্যমজুড়ে।

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...