সমসাময়িক ভাবনা, রেপার্টরি থিয়েটার ও কাঁচখেলা

ওয়াহিদুল ইসলাম:
মননে ও চিন্তনে থিয়েটার নিয়ে আমরা যারা বসবাস করি, যা রক্ত মাংসের থিয়েটার, জীবন্ত থিয়েটার। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সমাজের অন্যায় ও বৈষম্য বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার থেকে সত্য এবং সুন্দরের পক্ষে জয়গান গাই- যেখানে আলোর হাট বসে, কন্ঠের অনুরণনের খেলা চলে বিপুল বিস্ময়ে – সেই প্রাণের স্পন্দন মঞ্চ; পারফর্মার ও দর্শকদের মাঝে তাৎক্ষণিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মধ্য দিয়ে যে ভাবনার ক্যানভাস তৈরি হয়, সে-ই ভালবাসার উপাসনালয় আজ বিরাণ মরুভূমি !

মুখোশ পরা মানুষের মধ্যে ভোগবাদী জীবন আচার এতটা চরমে পৌঁছে গেছে যেখানে পৃথিবী প্রতিনিয়ত দিশেহারা। প্রকৃতি তার আপন নিয়মে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে মানুষকে করেছে গৃহবন্দী! এ-ই ক্রান্তিকাল কবে, কখন এবং কোথায় গিয়ে থামবে না-জানা এই আশংকা, যা মানবসভ্যতার নতুন এক অসহায় অভিজ্ঞতা।

রুদ্ধ দিনে এ-ই বিরুদ্ধ সময়ে কাঁচখেলা রেপার্টরি থিয়েটারের আবির্ভাব, এ যেন ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃজনকে খুঁজে নেয়ার আকুল তাড়না। যে তাড়নায় একজন অভিনেতা সায়েম সামাদকে অতৃপ্তি যাতনা নিয়ে হাটতে হয়েছে কতটা অযুত সময়, আরেকজন ক্ষ্যাপা আততায়ীর বিমূর্ত খঞ্জরে হৃদয়ের রক্তক্ষরণে কাটিয়েছে কতটা বিনিদ্র রজনী- জন্মজয়ন্তীতেযাত্রার সম্মিলন ঘটেছে কাঁচখেলা’র মোহনায়!

অনেক ঘামে আর শ্রমে আমাদের কিংবদন্তি অগ্রজদের নির্মাণ করা পথে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের নিরন্তর এ’ছুটে চলার সহযাত্রী হয়ে আমাদের প্রাণের প্রয়াস কাঁচখেলা রেপার্টরি থিয়েটার। গ্রুপ থিয়েটারের চিরন্তন আবেদনকে সাথে নিয়ে সময়ের দাবি রেপার্টরি থিয়েটার ভাবনা, আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে। রেপার্টরি থিয়েটার বলতে আমাদের চোখে সামনে ভেসে ওঠে একটা কোম্পানী যেখান থিয়েটার নিয়ে কাজ হবে সারা বছর, সেখানকার নট-নটী ও কুশীলবরা থিয়েটারের প্রাপ্ত আয় থেকে জীবিকা নির্বাহ করবে। আমাদের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ শ্রদ্ধেয় নাট্যজন মামুনুর রশীদ’র হাত ধরে আমাদের এখানে রেপার্টরি নাট্যচর্চা শুরু হয়। হাটি হাটি পা পা করে যে প্রারম্ভিক যাত্রা সূচিত হয়েছিল যৎসামান্য সম্মানীতে সেখানে অর্থনৈতিক বিষয়টি একমাত্র মুখ্য হয়ে দাড়ায়নি, গ্রুপ থিয়েটার চর্চার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন দলের নাট্যকর্মীরা অন্য একটি প্লাটফর্মে এসে নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করছে, সেখানেই রেপার্টরি থিয়েটারের মাহাত্ম্য। তবে পরিপূর্ণ রেপার্টরি থিয়েটার চর্চায় যেতে হলে এ’ মাধ্যমে যেমনি সরকারি প্রণোদনা দরকার, তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব না।

শুধু সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী না হয়ে; ভালবাসা দিয়ে যে বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি হয়, সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সেই বিশ্বাসের জায়গাটা সত্য হয়,আর পারস্পরিক সমঝোতার মধ্যে দিয়ে সেই সত্যকে নিয়ে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটা দৃঢ় হয়। সেই জায়গা থেকেই.. থিয়েটার স্কুলিং মধ্যে দিয়ে আমরা নবযাত্রা শুরু করতে চেয়েছিলাম। বিরুদ্ধ সময় থমকে দিয়েছে, কিন্তু দমাতে পারে নি। নাট্যচর্চাকে জিইয়ে রাখতে বৈশ্বিক মহামারী করোনা কালীন সময়ে কাঁচখেলা শ্রুতি নাটক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রোতা-দশর্কদের কাছে প্রতিভাত হয়েছে। ৮ মে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তিতে আমাদের প্রথম প্রযোজনা ‘হটাৎ দেখা’ মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এক এক করে আমরা ইতোমধ্যে ৪টি প্রযোজনা শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি। আমাদের সর্বশেষ প্রযোজনা ‘নার্গিস-নজরুল’ শ্রোতাদের কাছ থেকে ব্যপক সাড়া ফেলেছে, মিডিয়া পার্টনার রেডিও ধ্বনি কবি গুরু জন্মদিনে তিন তিনবার প্রচার করে, যা রেডিও ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা। আর এই সব কর্মযজ্ঞে যারা আমাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করছে পাণ্ডুলিপি রচনা করে সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল লেখক নাট্যকার নাসরীন মুস্তাফা, কাস্টিং ডিরেক্টর হিসেবে অভিনেতা সায়েম সামাদ, আবহ ও সম্পাদনায় নির্মাতা হামিদুর রহমান পাপ্পু এবং বিভিন্ন প্রযোজনায় অতিথি শিল্পীবৃন্দ। অশেষ কৃতজ্ঞতা, যারা আমাদের সাথে কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতে আমাদের কাজের সাথে যুক্ত থাকবেন।

যান্ত্রিক বিশ্বে প্রায় ভুলতে যাওয়া অথচ অত্যন্ত জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম শ্রুতি নাটক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে স্বমহিমায় তুলে ধরা ছিল একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ শ্রোতাদের ভালোবাসায় কতটা অতিক্রম করতে পেরেছি তা সময় বলে দেবে। তবে তৃপ্ত হতে পারিনি। যেতে হবে বহু দূর।

বহুমাত্রিক পরিকল্পনা নিয়ে আগামী দিনে নতুন নতুন প্রযোজনা আসছে কাঁচখেলা’র ব্যানারে। ‘আধুনিক থিয়েটারের মাঝে বাংলার চিরায়ত বিনোদন ভাবনা’- এই দর্শন সামনে রেখে সৃষ্টির সৃজনশীলতায় আমরা কাজ করে যেতে চায় দর্শক-শ্রোতাদের ভালোবাসায় ও অনুপ্রেরণায়। এ’ বিশ্ব একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে জনজীবনে, মানুষ মানবিক হয়ে উঠবে, জীবনের জয় গান গেয়ে মঞ্চের আলো জ্বলবে, মুখোরিত হয়ে উঠবে শিল্পকলার আঙিনা, মহিলা সমিতিসহ দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মিলনায়তন। সেই দিনের অপেক্ষায়.. বাংলা নাটকের জয় হোক, থিয়েটারের জয় হোক।

লেখক: দলনেতা, কাঁচখেলা রেপার্টরি থিয়েটার।
(ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া)

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
Loading...