আমারও কিছু ঋণ আছে

হাসানুজ্জামান সাকী:

২০০২ সালের কথা। প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যায় যুগান্তর অফিসের নিউজ সেকশন গমগম করছে। সবাই ব্যস্ত। আর কিছুক্ষণ পরই ফার্স্ট এডিশন প্রেসে উঠবে। সন্ধ্যার এ সময়টায় সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও চিফ রিপোর্টার তাদের নিজস্ব রুম ছেড়ে নিউজ রুমের ডেস্কে এসে বসেন। ফলে নিউজ রুম থাকে তটস্থ। এমন সময় আমাকে দেখে বাবু ভাই ইশারায় ডাকলেন।

রাশীদ উন নবী বাবু। যুগান্তরের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক। সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের পাশেই তারও কিউবিকাল ডেস্ক। সচরাচর আমরা সারওয়ার ভাইয়ের সামনে পড়তে চাই না। বাধ্য হয়েই বাবু ভাইয়ের ইশারায় তাঁর ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সারওয়ার ভাই আড়চোখে একবার দেখলেন আমাকে। সারওয়ার ভাইয়ের এই তাকানোর ভঙ্গিটা তাঁর সঙ্গে যারা কাজ করেছে তাদের কাছে খুব পরিচিত।

তখনও কম্পিউটার এতটা জনপ্রিয় হয়নি। নিউজপ্রিন্টের প্যাডে রিপোর্টাররা লিখতেন, এডিটররা সেটাতেই কলম চালাতেন। বাবু ভাই তাঁর সামনে থাকা কাগজের প্যাডটা টেনে নিলেন। তার ওপর সিটি সেলের একটা নম্বর লিখলেন। কাগজ টুকরোটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে সারওয়ার ভাই যেন শুনতে না পান এমন নীচু স্বরে বললেন, নাও, কাল দেখা করো। যাওয়ার আগে বললেন, ফাহিমকে ডেকে দিও। ফাহিম আহমেদ যুগান্তরের সহ-সম্পাদক। বুঝলাম, তিনি ফাহিমকেও একই ধরনের টুকরো কাগজ ধরিয়ে দেবেন।

যুগান্তর-এ ওইদিনই রাশীদ উন নবী বাবু ভাইয়ের শেষ কর্মদিবস ছিল। পরদিনই তিনি নতুন একটি চ্যানেলে যোগ দিতে যাচ্ছেন- এনটিভি। বিষয়টি জানতাম। বাবু ভাই আমাকে আর ফাহিমকে এনটিভিতে নিতে চান। তিনি মনে করেছিলেন, আমরা দুজন টিভিতে ভাল করবো।

বাবু ভাইয়ের সাথে দেখা করেছিল ফাহিম। আমি সারওয়ার ভাইয়ের প্রতি মোহবিষ্ট ছিলাম। আমি যুগান্তরেই রয়ে গেলাম। ফাহিম আর আমি সাংবাদিকতায় (প্রিন্ট মিডিয়ায়) আমরা সমসাময়িক। কিন্তু এনটিভিতে যোগ দিয়ে সে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় আমার সিনিয়র হয়ে গেল।

বাবু ভাইয়ের সাথে অনেক পরে একবার এনটিভিতে দেখা করতে গিয়েছি। তিনি আক্ষেপ করেছিলেন। কিছুটা মনক্ষুন্ন হয়েছিলেন কী? মনে হয় না। কেননা, কয়েক বছর পর তিনি আবারও আমাকে ডাকলেন। বললেন, নতুন একটা টিভি চ্যানেল আসছে ‘বৈশাখী’ নামে। শওকত মাহমুদ আছে ওখানে নিউজের প্রধান হিসেবে। হোটেল সারিনায় কাল থেকে চ্যানেলটির ট্রেনিং শুরু হবে। ইন্ডিয়া থেকে খুব ভাল ট্রেইনার এসেছে। যাও, দেখা কর। আমি তোমার কথা বলে রেখেছি। শওকত ভাই আমাকে নামে চিনতে পারেননি। কিন্তু আমাকে দেখেই চিনলেন। কেননা, ছাত্রজীবনে তাঁর বার্তা সংস্থায় (মিডিয়া সিন্ডিকেট) আমি কিছুদিন কাজ করেছি।

যাক। বাবু ভাইয়ের কল্যাণে আমি টিভি মিডিয়ায় পা ফেললাম। অনেক কিছু শিখলাম। টিভিতে কাজ করার অনেক টিপস দিয়েছেন তিনি আমাকে। আমি তখন হাতিরপুলে থাকি। ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। আর বাবু ভাই থাকেন ভাবীর সরকারি কোয়ার্টারে, এলিফ্যান্ট রোডে। বাবু ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গিয়ে ভাবীর সাথে আলাপ হলো, একমাত্র মেয়ে অনন্যার সাথে পরিচয় হলো। বৈশাখীতে যোগ দেওয়ার আগে আমি সমকাল-এ কিছুদিন ছিলাম। সেখানে আমার সহকর্মী হিসেবে পেলাম মনিরা রুমীকে। মনিরা আপা বাবু ভাইয়ের ছোট বোন। মনিরা আপার সাথেও আমার সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠলো। অনন্যা যখন তাঁর ফুপুর কাছে সমকাল-এ আসতো তখন আমার রুমেই গল্প-গুজব করতো। ফলে সবমিলিয়ে আমি বাবু ভাইয়ের পরিবারের একজন হয়ে গেলাম।

অনেক দিন বাবু ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ নেই। তারপর একদিন শুনলাম তিনি “সকালের খবর’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা বের করছেন। সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। একদিন সন্ধ্যায় রেঙ্গস ভবনের পাশে বাবু ভাইয়ের নতুন অফিসে গেলাম। অনেকদিন পর আমরা এক সাথে– আমি আর আমার বন্ধু ফাহিম। ততদিনে ফাহিম টিভি চ্যানেলের ব্যবস্থাপনায় বেশ ঈষর্ণীয় একটি নাম। আমরা দুই বন্ধু কোথাও এক জায়গায় হয়েছিলাম, সেখান থেকে বাবু ভাইকে দেখতে গেলাম। বাবু ভাই, ফাহিম, আমি আবার আমরা অনেকদিন পর তিনজন একসাথে হলাম।

এরপর বাবু ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ বলতে কেবল ফেইসবুক। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন এই খবরটা যখন পাই তখন চিকিৎসার জন্য বাবু ভাই ভারতে। মুম্বাইয়ে ও ভেলোরে দু’দফা বাবু ভাইয়ের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল আমার। তিনি যে কী ভীষণ খুশি হয়েছিলেন, টেলিফোনেও আমি যেন তাঁর আনন্দটা টের পাচ্ছিলাম।

৮ জুলাই ২০২০ বুধবার। বাবু ভাই না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আমি তখন টিভিতে লাইভ টকশোতে। এন্ড্রু কিশোর স্মরণে একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছি। লাইভেই আমার মোবাইলে মেসেজ আসলো। এক সময়ের সহকর্মী কাজী লুৎফুল কবীর জানালেন বাবু ভাই আর নেই। এন্ড্রুদার মৃত্যুতে আমরা সবাই ব্যথিত ছিলাম। তিনিও ক্যান্সারের কাছেই পরাজয় মেনেছিলেন। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম, আজ ভারাক্রান্ত থাকবো না। হাজারো গান দিয়ে, শত শত জনপ্রিয় গান দিয়ে এন্ড্রু কিশোর যেভাবে মানুষকে আনন্দ দিয়ে গেছেন, আমি চেয়েছিলাম আজকের অনুষ্ঠানটিও সেভাবেই চালাবো আমরা। আজ মন খারাপ করা নয়, আনন্দ নিয়েই অতিথি শিল্পীদের গান শুনবো। এন্ড্রুদাকে স্মরণ করবো তারই গানে গানে।

জীবন বড়ই অদ্ভূত। আমাদের জীবনেও দু:খ থাকে, কষ্ট থাকে, বিরক্তি থাকে। কিছু ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে। কিন্তু ক্যামেরার সামনে আমাদের সবকিছু ভুলে থাকতে হয়। হাসি হাসি মুখ করে থাকতে হয়। বাবু ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদটা শোনার পর আমি ভেঙে পড়লাম। অনুষ্ঠানে বললামও সে কথা। তবুও অনুষ্ঠান চালিয়ে যেতে হলো আমাকে।

নাটক সিনেমা মঞ্চে অভিনয় না করেও আমরা একেক জন কী বড়ই না অভিনেতা!!

নিউজনাউ/এসএ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...