বেশি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি

নিউজনাউ ডেস্ক: খাবারেই বাঁচে জীব। সেটা প্রত্যক্ষ হোক আর পরোক্ষভাবে হোক। যার জীবন আছে তার বেঁচে থাকার একমাত্র পাথেয় খাদ্যগ্রহণ। খাবারে জীবন বাঁচলেও তা অতিরিক্ত গ্রহণ করলেও কখনো কখনো সেটা প্রাণঘাতীও হয়ে উঠে। পরিমিত খাবার গ্রহণ করা যেমন স্বাস্থ্যের জন্য বাধ্যতামূলক তেমনি অতিরিক্ত খাবার পরিহার করা খুবই গুরুত্বের সাথে দেখা উচিৎ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের ৮০ শতাংশ রোগব্যাধি খাবারের কারণেই হয়ে থাকে। অপরিমিত খাবারই মানুষকে দিন দিন মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। ল্যানসেটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দৈনন্দিন যে খাদ্য তালিকা সেটিই ধূমপানের চেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটায় এবং বিশ্বব্যাপী প্রতি পাঁচটি মৃত্যুর মধ্যে একটির জন্য এই ডায়েট বা খাবারই দায়ী।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে ২৩.৬ শতাংশ বা এক কোটি ১৬ লাখ লোকের অকাল মৃত্যু ঠেকানো যাবে।

অধিক ভোজনের প্রাথমিক ফল হলো ডায়াবেটিস। কেননা বেশি খাওয়ার কারণে লালগ্রন্থিকে বেশি কাজ করতে হয়। এ কারণে অভ্যন্তরীণ ইনসুলিন কমে যায় এবং রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়। অধিক ভোজন রক্তের চাপ বৃদ্ধির আরেকটি অত্যাবশ্যকীয় কারণ। কেননা ডায়াবেটিস এবং ব্লাড প্রেসার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। অধিক ভোজনের কারণে প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। এতে রক্তবাহী শিরাগুলো সংকীর্ণ হয়ে যায়। ফলে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। এভাবে যখন শিরাগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, তখন সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনুভূতিহীন হয়ে যায়। আর এ অবস্থা মস্তিষ্কের কোনো অংশে হঠাৎ প্রকাশ পেলে মানুষ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়।

আর অধিক ভোজনের ফলে অসময়ে বার্ধক্যে পতিত হয়ে থাকে। কেননা বেশি খেলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দুর্বল বা শক্তিহীন হয়ে যায় এবং তাকে অতি অল্প বয়সেই বৃদ্ধ বলে মনে হয়। অধিক ভোজনের কারণে শরীর মোটা বা স্থূল হয়ে থাকে। এই অবস্থায় বহুবিধ রোগব্যাধি হয়ে থাকে।

খেতে বসলেই আমরা চারদিকে খাবার সাজিয়ে বসি। এছাড়াও অতিথি এলে প্লেট ভর্তি খাবার পরিবেশনেই আমরা অভ্যস্ত। প্লেটে দুরকম ভাজা কম হলে কিংবা যদি একটা রসগোল্লা কম থাকে তাহলে অনেকেরই মনে হয় এতে অতিথির অপমান করা হলো। জন্মদিন হোক কিংবা কোনো অনুষ্ঠান, থালা ভর্তি খাবার সাজিয়ে পরিবেশন করেন অনেকে।

চোখের সামনে থালা ভর্তি মিষ্টি কিংবা অন্য কোনো খাবার থাকলে লোভ সংবরণ মুশকিল হয়। সবাই তা পারেন না। যখন একটা মিষ্টি খেলেই শরীরের চাহিদা পূরণ সম্ভব, সেখানে হয়তো কেউ তিনটি মিষ্টি খেয়ে ফেললেন। শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমা তো হলোই এমনকি এখান থেকে হতে পারে জটিল ব্যাধি। আর তাই বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন পরিমিত আহারে। খুব কম নয়, খুব বেশিও নয়…শরীরের ঠিক যতটা প্রয়োজন ততটাই খান। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খেলে যে যে সমস্যা আসতে পারে

শরীরে প্রচুর পরিমাণ মেদ জমে। বেশি খাওয়া মানেই বেশি ক্যালোরি জমা হওয়া। আর পর পর খাবার খেতেই থাকলে সেই ক্যালোরি বার্ন হয় না। ফলে শরীরে হতে থাকে ফ্যাটের স্তর। যেখান থেকে ওবেসিটি আসতে বাধ্য।

বেশি খাওয়া অভ্যেস হয়ে গেলে শরীর খিদে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারায়। অর্থাৎ কখন খিদে পাচ্ছে, কতটা খাওয়া প্রয়োজন এই অনুভূতিটাই চলে যায়। বেশি খাওয়া মানেই লবণ, চিনি বেশি মাত্রায় খাওয়া। এখান থেকে হরমোনের তারতম্য হয়। ফলে তখন খাবার খাওয়ার কোনো আনন্দ থাকে না।

ওবেসিটি ছাড়াও শরীরে আরও পাঁচটা রোগ এসে জড়ো হয়। যার মধ্যে খুব সাধারণ হল হার্টের সমস্যা, ডায়াবিটিস ও স্ট্রোক। এছাড়াও রক্তচাপ বেশি থাকে। এমনকী সুগারের মাত্রাও বেড়ে যায় অনেকখানি। বিভিন্ন ক্রনিক রোগ শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করে। কোশে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। কোনও কারণে অসুস্থ হলে তখন সব ওষুধ ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে যায়।

সমীক্ষা বলছে কোনও মানসিক চাপ, উদ্বেগের মধ্যে থাকলে অনেকেই বেশি খেয়ে ফেলেন। এছাড়াও যারা প্রথম থেকেই পরিমাণে একটু বেশি খান তাদের সেই অতিরিক্ত ওজন প্রভাব ফেলে স্মৃতিশক্তিতে। কখন খাচ্ছেন তা নিজেরাই মনে রাখতে পারেন না। যেখান থেকে অতিরিক্ত খাওয়া হয়ে যায়।

বেশি খেলে হজমের সমস্যা, গ্যাস- অম্বলের সমস্যা এসব আসতেই পারে। এবং আসাটা খুব স্বাভাবিক। বেশি খেলেই হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়। এছাড়াও অনিদ্রা, মাথা ধরা, পালস রেট বেড়ে যাওয়া এসব থাকেই। এছাড়াও ইনসুলিন ক্ষরণ বেড়ে যায়। খেয়ে যদি বমি, গ্যাস, অম্বলের সমস্যায় ভুগতে হয় তাহলে সেখান থেকে হতে পারে বড় কোনও সমস্যা। আসতে পারে ক্যানসারের মতো ব্যাধিও। যে কারণে কখনই পেট ভরে কিংবা থালা ভর্তি করে খাবার খাবেন না। এমনকী থালা ভর্তি ফলও নয়।

প্রফেসর রিচার্ড বার্ড গবেষণার পর প্রকাশ করেছেন যে বেশি খাদ্য খেলে যেসব জটিল রোগব্যাধির সৃষ্টি হয় সেগুলো হলো মস্তিষ্কের ব্যাধি, চক্ষুরোগ, জিহ্বা ও গলার ব্যাধি, বক্ষ ও ফুসফুসের ব্যাধি, হৃদেরাগ, যকৃৎ ও পিত্তের রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মস্তিষ্কের শিরা ফেটে যাওয়া, দুশ্চিন্তাগ্রস্ততা, অর্ধাঙ্গ রোগ, মনস্তাত্ত্বিক রোগ, দেহের নিম্নাংশ অবশ হয়ে যাওয়া।

স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মতে, মানুষের কোমর সোজা রাখার জন্য পরিমিত আহারই যথেষ্ট। অতিরিক্ত খাবার নয়, পরিমিত খাবারেই খাবারের আসল তৃপ্তি আসে। তাই আমাদের সবসময় বুঝে শুনে পরিমিত খাওয়া দাওয়া করা উচিত। এবং সবসময় বিশুদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত।
নিউজনাউ/এনএইচএস/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...