১২ বছরের রেকর্ড ভেঙে হালদায় ডিম উৎসব

0 34

আবু তালেব, হাটহাজারী থেকে: বৃহস্পতিবার অমাবস্যা তিথির জো’র প্রথম রাতে চট্টগ্রামের হালদা নদীতে ডিম ছেড়েছে রুই জাতীয় (রুই, কাতাল, মৃগেল ও কালিবাইশ) মা-মাছ। বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার মিঠা পানির প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় বারো বছরের পুরানো রেকর্ড ভেঙে প্রায় ২৫ হাজার ৫শ ৩৬ কেজি ডিম সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত ১২টার দিকে জোয়ারের সময় মা-মাছের কিছু নিষিক্ত ডিম পেলেও শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে পুরোদমে ডিম ছেড়েছে মা-মাছগুলো। যার পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ৫শ ৩৬ কেজি।

মৎস্য অধিদপ্তর, হালদা রিভার রিচার্স সেন্টার ও হালদায় প্রকল্প কাজে নিয়োজিত এনজিও সংস্থা আইডিএফসহ তিনটি দফতরের কর্মকর্তারা মা-মাছের দেয়া এ নিষিক্ত ডিমের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। যা বিগত ১২ বছরের রের্কডকে ছাড়িয়ে গেছে বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রুহুল আমিন।

 

দেশে আবহাওয়া কিছুটা বৈরী হলেও হালদা নদীর আবহাওয়াগত পরিবেশ অনুকূলে থাকায় মা-মাছের দেয়া নিষিক্ত ডিম সংগ্রহে বংশ পরম্পরায় অভিজ্ঞ ও পারদর্শী প্রায় সাড়ে ৬শ ডিমসংগ্রহকারী ছিলেন প্রস্তুত। ডিম ধরার মশারি জাল, বালতিসহ নানা সরঞ্জাম নিয়ে হালদার নদীর বুকে ২৮০টি নৌকায় ডিম সংগ্রহ করেছেন মৎস্যজীবীরা।

 

সরেজমিনে ডিম ছাড়ার স্থানসমূহ ঘুরে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার দিনগত রাত থেকে হালদা নদীর আজিমের ঘাটা হয়ে গড়দুয়ারা পর্যন্ত ডিমসংগ্রহকারী মৎস্যজীবীরা নমুনা ডিম সংগ্রহ করে। এরপর শুক্রবার সকাল থেকে ডিম আহরণের নানা সরঞ্জাম নিয়ে হালদার হাটহাজারী ও রাউজান অংশের রামদাশ মুন্সীর হাট, আমতুয়া ও নাপিতের ঘাট এবং দুপুরের পর থেকে আজিমের ঘাট হয়ে গড়দুয়ারা নয়াহাট পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার এলাকায় উৎসব মুখর পরিবেশে ডিমসংগ্রহকারীরা সবচেয়ে বেশি মা-মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করেছেন।

 

এছাড়া রাউজান উপজেলার কাগতিয়া, খলিফার ঘোনা, পশ্চিম গহিরা অংকুরী ঘোনা, বিনাজুরী, সোনাইর মুখ, আবুরখীল, খলিফার ঘোনা, দক্ষিণ গহিরা, মোবারকখীল, মগদাই, উরকিচর এবং হাটহাজারী গড়দুয়ারা, সিপাহির ঘাট, উত্তর মার্দাশা, মদুনাঘাট ইত্যাদি এলাকায়ও ডিম পাওয়া যায়।

 

হাটহাজারী উপজেলার গড়দুয়ারা নয়াহাট এলাকার স্থানীয় ডিমসংগ্রহকারী মৎস্যজীবী কামাল সওদাগর ও রাউজানের অংকুরী ঘোনা এলাকার উদয়ন বড়ুয়া নিউজনাউকে বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে নদীতে মা-মাছ ডিম ছাড়লেও দুপুরের পর থেকে ডিমের পরিমাণ বাড়তে থাকে। নৌকায় করে মৎস্যজীবীরা মা-মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করেছে। কেউ এক বালতি, কেউ ২-৩ বালতি, আবার কেউ সর্বোচ্চ ১২ বালতি পর্যন্ত ডিমসংগ্রহ করেছে। প্রতি বালতিতে ১৫ কেজির মত ডিম ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।’

 

এদিকে, মা-মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের পর রেণু পরিস্ফুটনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হাটহাজারী উপজেলার শাহমাদারি, মাছুনাঘোণা, মদুনাঘাট তিনটি সরকারি হ্যাচারি ও ১৬৭টি কুয়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয়রা সনাতন পদ্ধতিতে সংগৃহীত ডিম থেকে রেণু পরিস্ফুটনের আরও শতাধিক কুয়া তৈরি করেছে। মৎস্যজীবীরা হ্যাচারিগুলোতে ডিম সংগ্রহের পর রেণু পরিস্ফুটনের জন্য নিয়ে আসতে শুরু করেছে। সময় যত বাড়বে, ডিমের পরিমাণ তত বাড়বে বলে জানান হাটহাজারী উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা রনি।

 

 

ইউএনও মো. রুহুল আমিন নিউজনাউকে বলেন, রাতেই মা মাছ নমুনা ডিম ছাড়ে। সকাল থেকে ডিম ছাড়ার পরিমাণ বাড়ে। ডিম সংগ্রহের পর থেকে শুরু হয়েছে রেণু ফোটানোর কাজ। দ্রুত বড় হয় বলে হালদার পোনার চাহিদা বেশি মাছচাষিদের কাছে।’ ডিম ছাড়ার পর কেউ যাতে দুর্বল মা-মাছ শিকার করতে না পারে সে লক্ষ্যে প্রশাসন কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করেছে বলে জানান তিনি।

 

প্রসঙ্গত, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান ও ফটিকছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় জুড়ে বয়ে গেছে। এটি বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটা নদী যেখান থেকে সরাসরি রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পূর্ণিমায় প্রবল বর্ষণ আর মেঘের গর্জনের পর পাহাড়ি ঢল নামলে হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছ স্মরণাতীত কাল থেকে ডিম ছেড়ে আসছে।

 

নিউজনাউ/পিপিএন

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...