বর্ষাই যাদের ভরসা

নুর নবী রবিন, সন্দ্বীপ থেকে:

বর্ষায় জমিতে আমন ধান করে টাকা ফেরত দিবে- এই শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চৈত্র মাসে মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা ধার নিয়েছিল আবুল কালাম। জমির চিড়িং বেঁচে মহাজনের পাওনা পরিশোধের ভাবনা আকতার হোসেনের। কোরাল মাছের পোনা বিক্রির টাকায় ভাঙা বাড়িতে টিনের ঘর তোলার স্বপ্ন মোহাম্মদ রিপনের।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন উড়িরচরের এই তিন বাসিন্দার মতো পুরো চরের আশি শতাংশ মানুষের জীবন জীবিকা পরিচালিত হয় বর্ষাকে কেন্দ্র করেই। জমিতে কৃষি কাজ, মাছ ধরা আর পুকুরের পাড়ে সবজি চাষ করে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা এ মানুষগুলোর জন্য বর্ষা এক আশির্বাদের নাম।

গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত মিলিয়ে ষড়ঋতুর এ দেশে ঋতুভেদে যেমন প্রকৃতির আছে রকমফের, তেমনি পার্থক্য আছে মানুষের কাজ আর কাজের ধরনের। শহুরে মানুষের যাপিত জীবনে ঋতুর পরিবর্তন তেমন প্রভাব না পড়লেও গ্রামের মানুষ এর সাথে জড়িত আষ্টেপৃষ্টে। গ্রীষ্মের খরতাপে উত্যপ্ত জমিতে যখন পা রাখা যায় না, তখন এখানের মানুষেরা মুখিয়ে থাকে বর্ষার অপেক্ষায়। বর্ষা এলে কাজ হবে, কাজ পাবে, দু’চার পয়সা ইনকাম হবে। এ ভরসায় শুষ্ক মৌসুমে ঋণ করে খায়। খাওয়ায় স্ত্রী সন্তাদের।

সে অনেক আগে আল্লাহকে ডাকার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বর্ষা-বৃষ্টিকে ডেকেছেন মরহুম শিল্পী আব্বাস ঊদ্দিন তাঁর একটি কালজয়ী গানের মাধ্যমে। ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই আল্লাহ মেঘ দে’ এই গানেই লুকিয়ে আছে বাঙালির বর্ষা আহবানের চিত্র। কিংবা কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করে ‘বৃষ্টি এবং সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ কবিতায় কৃষকের কান্না শুনতে পেয়ে লিখেছেন ‘আমাদের চিরবন্ধ্যা ভূমি, বৃষ্টির আদরে যেন গর্ভবতী হয়।’

কিন্তু অনেক সময় ভাসমান শ্রমজীবীদের পানে মুখ তোলে তাকায় না পরম আকাঙ্খিত বর্ষা। অতিবৃষ্টি কিংবা অনাবৃষ্টিতে ধান হয় না। জমিতে পাওয়া যায় না চিড়িং মাছ। কিংবা হাটে বিক্রি করতে পারে না কোরালের পোনা। তখন এদের জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা।

হতাশার কালো মেঘ ভীড় জমায় এদের সংসারে। ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যায় শহর বন্দরের কারখানা কিংবা ইট ভাটায়। আর স্বপ্ন দেখে পরবর্তী বর্ষার। আরেক বর্ষায় ভরসা করে বেঁচে থাকে এ ধরাধামে।

নিউজনাউ/পিপিএন

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
Loading...