আছে যাদের গাড়ি, তারাই যাবে বাড়ি!

0 225

পার্থ প্রতীম নন্দী, চট্টগ্রাম ব্যুরো:
মহামারি কারোনাক্রান্তিতেও জাতীয় জীবনে আসছে ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু যে উৎসবের আনন্দ সমষ্টিগত নয় সে উৎসবের প্রাণ নিশ্চয় থাকে না! তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ‘সীমিত আনন্দের’ সেই উৎসব এবার রঙহীন! মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর আসন্ন। আমাদের দেশে ঈদ মানেই ছিল বাড়ি ফেরার আনন্দ! কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দূরপাল্লার সকল গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় এবার সেই ধারায় ছেদ পড়েছে। করোনাকালে তাই নতুন এক ঈদ উদযাপন করবে দেশবাসী।

সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে ঈদে যাতে নিজ অবস্থান ছেড়ে কেউ গ্রামের বাড়ি না যেতে পারেন, সে ব্যাপারে জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এরমধ্যেই জারি হয়েছে ‘ঈদে ব্যক্তিগত পরিবহণে বাড়ি যাওয়া যাবে’ মর্মে এক নতুন রাষ্ট্রীয় ঘোষণা। যে ঈদ অনাবিল আনন্দ এনে দিত, রাষ্ট্রীয় এই ঘোষণায় সেই ঈদে দেশে ধনী-গরীবের বৈষম্য রেখা টেনে দেওয়া হল কি-না সেই প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেছেন অনেকে।

এই বিষয়টাকে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যেরই একটা অংশ হিসেবে দেখছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি এ প্রসঙ্গে নিউজনাউকে বলেন, ‘যাদের গাড়ি-বাড়ি আছে রাষ্ট্র তাদের প্রিভিলেজ দিবে এটাই স্বাভাবিক! কারণ এইটা বড়লোকের রাষ্ট্র, এমন সিদ্ধান্তে সেটাই আবার উন্মোচিত হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত একেবারেই অনুচিত হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়িতে করে দুইজনের বেশি বাড়ি গেলে সেখানে তো তিন ফিট দূরত্ব রাখার সুযোগ নেই। এই সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে বরং যাদের গাড়ি আছে তাদের নতুন করে করোনা আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হল!

ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি করার অনুরোধ জানিয়ে গণমাধ্যমে এক বিবৃতি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তবে ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্তকে অদূরদর্শী বলেছেন সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি নিউজনাউকে বলেন, ‘রমজানের শুরুতে বলা হয়েছিল নিজ অবস্থানে ঈদ করতে হবে। অতি সম্প্রতি আমরা দেখলাম পুলিশ প্রধান বলেছেন, কেউ যদি বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন তাকে রাস্তায় আটকে দেওয়া হবে এবং অনেক যাত্রীকে ফেরতও দেওয়া হয়েছিল। মানুষ যে যেখানে আছে তাকে সেখানে রাখায় এখন মূল কাজ। তবে এই কাজটি যথাযথ কর্তৃপক্ষ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।’

ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় অনেকেই এর ফায়দা নিচ্ছে জানিয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। সেখানে সংখ্যার অধিক যাত্রী নিচ্ছেন ড্রাইভাররা। জানলা বন্ধ করে এসিতে সেই অধিক যাত্রীর ভ্রমণ করোনার ঝুঁকি বাড়াবে বলেও তিনি আশংকা প্রকাশ করেছেন।

দুইদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই বিষয়ে ছিল বেশ সরব। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তার ফেইসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, ঈদে প্রাইভেট গাড়ি চলবে। পাবলিক গাড়ি চলবে না। এধরনের ‘প্রাইভেট দেশ’ বানানোর জন্য ৩০ লক্ষ শহীদ দেশ স্বাধীন করে নাই।

এই প্রসঙ্গে চ্যানেল ২৪ রিজিওনাল এডিটর কামাল পারভেজ তাঁর ফেইসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, ‘পুলিশ বলছে, ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি যাওয়া যাবে। (যদিও যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই তারা কিভাবে যাবে তার ব্যাখ্যা নেই।) আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বললেন, আপনারা শহর ছেড়ে গ্রামে যাবেন না। তাহলে আম জনতা কারটা শুনবে?’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিউদ্দীন মাহিম তার ফেইসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, ‘যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে, তারা যদি বাড়িতে ঈদ করতে যেতে পারে, তাহলে যাদের গাড়ি নেই তাদের কী অপরাধ? আসলে সমস্যাটি গাড়ির নয়, বাড়ির৷ এটি পুঁজিবাদী মানসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়৷’

চট্টগ্রাম নগরীতে ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহণের দৃশ্যেরও দেখা মিলেছে সিটি গেইট, অক্সিজেন ও নতুন ব্রিজ এলাকায়। তবে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সিএমপির পক্ষ থেকে এই ধরণের চেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযানও চলছে। গত দুইদিনে কয়েকটি পয়েন্ট থেকে এই অপরাধে প্রায় দশের অধিক কার-মাইক্রোবাসকে জরিমানা করতেও দেখা গেছে।

নিয়মিত অভিযান প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম নিউজনাউকে বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির অপব্যবহার করে এবং গাড়ির গায়ে ‘ইমারজেন্সি রোগী’ সহ বিভিন্ন ভুয়া স্টিকার লাগিয়ে অপকৌশলে অনেকে প্রাইভেট কার এবং মাইক্রোবাস ভাড়া করে চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। একই গাড়িতে কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘপথ ভ্রমণ করলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি প্রবল। জেলা প্রশাসন চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রস্থান পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালতের  কঠোর নজরদারি রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম মোস্তাক আহমেদ খান নিউজনাউকে বলেন, ‘আমাদের বক্তব্যটা স্পষ্ট। কেউ যদি বাড়ি যেতে চাই সে ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি যেতে পারবে। তবে অনেকেই এর অপব্যবহার করছে। গার্মেন্টসের গাড়িতে, অ্যাম্বুলেন্সে রোগী সাজিয়েও যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। আমরা এইগুলো এলাউ করছি না। প্রতিটা পয়েন্টে আমরা যাচাইবাচাই করছি।’

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে তাদেরই শুধু বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে এলাউ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নিউজনাউ/এবি/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...