alo
ঢাকা, বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৮, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কনটেইনারে লুকিয়ে ১৩ বছরে ৯ বার বিদেশ যাত্রা, তিন মামলায় দায় সেড়েছে কর্তৃপক্ষ

প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারী, ২০২৩, ০৫:৫৪ পিএম

কনটেইনারে লুকিয়ে ১৩ বছরে ৯ বার বিদেশ যাত্রা, তিন মামলায় দায় সেড়েছে কর্তৃপক্ষ
alo

চট্টগ্রাম ব্যুরো: কিশোর ফাহিম মালয়েশিয়ার কেলাং বন্দরে ছেড়ে যাওয়া ‘এমভি ইন্টেগ্রা’ জাহাজের একটি খালি কনটেইনারে আটকা পড়ে। কনটেইনারের ভেতর থেকে শব্দ শুনতে পান নাবিকেরা। এরপর জাহাজটি জেটিতে এনে ২০ ফুট লম্বা কনটেইনার খুলে ওই কিশোরকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৭ জানুয়ারি। 

তবে, জাহাজের খালি কনটেইনারে লুকিয়ে এমন যাত্রা এবারই প্রথম নয়। ২০১০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯ বার ঘটেছে এমন ঘটনা। এরমধ্যে সাত জনকে জীবিত ফেরত আনা গেলেও মৃত্যু হয়েছে দুইজনের। এসব কর্মকাণ্ড যেমন প্রশ্ন উঠেছে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তেমনি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তিও। বার বার এমন ঘটনায় কর্তৃপক্ষকে দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায়নি। 

নিয়ম অনুযায়ী—খালি কনটেইনার জাহাজে তোলার আগে যাচাই করার কথা তিন ধাপে। বন্দরে নেওয়ার আগে প্রথমে তা খুলে যাচাই করার দায়িত্ব ডিপো কর্তৃপক্ষের। এরপর বন্দরের ফটক দিয়ে ঢোকার সময় দ্বিতীয়বার এটি যাচাই করার কথা বন্দরের নিরাপত্তাকর্মীর। সর্বশেষ জাহাজে তোলার আগে কনটেইনারের দরজা খুলে যাচাই করার কথা বন্দর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু যাচাই কাজ যথাযথভাবে হচ্ছে না দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে। নিরাপত্তা ত্রুটি থাকাতেই কনটেইনারে লুকিয়ে বিদেশ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

তিন মামলায় দায় সেড়েছে কর্তৃপক্ষ 

১৩ বছরে ৯ বার জাহাজের খালি কনটেইনারে লুকিয়ে বিদেশ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ নিয়ে যেন মাথা ব্যাথাই নেই তাদের। খালি কনটেইনারে কিভাবে মানুষ ওঠে— এটি জানতে তদন্ত কমিটি গঠন হলেও কারণ জানতে ব্যর্থ তারাও!

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, এ পর্যন্ত তিনটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে। বন্দর থেকে এভাবে ওঠার সুযোগ নেই। কিভাবে মানুষ কনটেইনারে ঢুকে পড়ছে, তা খুঁজে বের করবে তদন্ত কমিটি।

১৩ বছরে এমন ঘটনা ৯ বার 

২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর। সেদিন ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ রিপন বন্দরের ১৩ নম্বর জেটিতে থাকা ‘এমভি মার্কস উইলমিংটন’ জাহাজের কনটেইনারে লুকিয়ে মালয়েশিয়ায় চলে গিয়েছিলেন। তাকে সেখানে নামানোর অনুমতি না পেয়ে জাহাজটির যাত্রাপথে আফ্রিকার দেশ রি-ইউনিয়নে নামিয়ে দেন নাবিকেরা। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ১৫ জানুয়ারি তাকে ঢাকা বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফেরত আনা হয়।

ঠিক পরের বছরও ঘটেছে একই ঘটনা। ২০১১ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের অস্থায়ী শ্রমিক দ্বীন ইসলাম ও আল আমিন একটি খালি কনটেইনারে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কনটেইনারটি ‘এমভি হ্যানসা ক্যালিডোনিয়া’ জাহাজে তোলার পর সিঙ্গাপুর বন্দরের পাসির পানজাং টার্মিনাল নামানো হয় ৯ এপ্রিল। কনটেইনার খুলে দ্বীন ইসলামকে জীবিত ও আল আমিনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। 

এরপর ২৬ এপ্রিল শ্রীলঙ্কাগামী ‘এমভি টাম্পা বে’ নামের জাহাজে লুকিয়ে বিদেশে যাওয়ার সময় বরিশালের আকতার আলী নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেন নাবিকেরা। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সোয়েব রিপন নামের এক যুবক সিঙ্গাপুরগামী ‘এমভি হ্যানসা ক্যালিডোনিয়া’ জাহাজে লুকিয়ে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা চালায়। জাহাজের নাবিকরা তাকে ওই জাহাজে করে চট্টগ্রামে ফেরত নিয়ে আসেন। পরে ওই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি তাকে বন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়।

২০১৬ সালে চট্টগ্রামের একটি ডিপো থেকে কনটেইনার এনে বন্দর দিয়ে ‘এমভি সিনার বটম’ জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। ১৯ অক্টোবর ভারতের বিশাখাপত্তনম বন্দরে সেই জাহাজের একটি খালি কনটেইনার থেকে রোহান হোসেন নামের মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের বাসিন্দাকে ১২ দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়।

২০১৭ সালের ৩১ জুলাই যুক্তরাজ্যগামী পোশাকের একটি কনটেইনারের ভেতর থেকে শব্দ শুনে বাবুল ত্রিপুরা নামের শ্রমিককে উদ্ধার করেন চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তাকর্মীরা।

সর্বশেষ চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি-১ জেটি থেকে ১২ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার কেলাং বন্দরে ছেড়ে যাওয়া ‘এমভি ইন্টেগ্রা’ জাহাজের একটি খালি কনটেইনারে আটকা পড়ে কিশোর ফাহিম। ১৬ জানুয়ারি কনটেইনারের ভেতর থেকে শব্দ শুনতে পান নাবিকেরা। ১৭ জানুয়ারি জাহাজটি জেটিতে এনে ২০ ফুট লম্বা কনটেইনার খুলে ওই কিশোরকে উদ্ধার করা হয়।  

বন্দর ও ডিপো কর্তৃপক্ষের পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য

হংকংভিত্তিক 'এমবি ইন্টেগ্রা' জাহাজে ছিল এবারের কনটেইনারটি। এটির স্থানীয় শিপিং এজেন্ট চট্টগ্রামের কনটিনেন্টাল ট্রেডার্স বিডি লিমিটেড। 

জানা গেছে, নেমসন ডিপো থেকে খালি কনটেইনার নিয়ে জাহাজটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। এ জাহাজে রিলায়েন্স শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিকস লিমিটেডের ১০৫টি খালি কনটেইনার ছিল। এর একটিতে লুকিয়ে ছিল ওই কিশোর।

নেমসন কনটেইনার লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কাজী মুরাদ হোসেন জানান, 'বন্দর দিয়ে খালি কনটেইনার জাহাজে তোলার আগে তা দরজা খুলে ভালোভাবে যাচাই করা হয়। ডিপো থেকে কনটেইনারের ভেতরে মানুষ ওঠার সুযোগ নেই।' তবে বন্দর কর্তৃপক্ষও স্বীকার করছে না কোথা থেকে উঠেছে ওই কিশোর। 

এদিক বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, 'মালয়েশিয়ার বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনও আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। বন্দর থেকে এভাবে ওঠার সুযোগ নেই।'

শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, কনটেইনারের ভেতর লুকিয়ে বিদেশে যাওয়ার ঘটনার দায় বন্দর ও বেসরকারি আইসিডির কেউই এড়াতে পারেন না। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতির কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। এতে বিদেশে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।  

নিউজনাউ/আরএইচআর/২০২৩

X