৩ মাসের কমিটির ৮৮ মাসের রাজত্ব

পার্থ প্রতীম নন্দী, চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির মেয়াদ ফুরিয়েছে সেই বহু বছর আগে। ৩ মাসের সময় বেঁধে দিয়ে ২০১৩ সালের ১৪ জুলাই ঘোষিত হয়েছিল ১০১ সদস্যের নগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি। কিন্তু ৮৮ মাসেও সম্মেলন করতে পারেনি তারা। প্রায় সাড়ে ৭ বছরে ৪৩টি সাংগঠনিক ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৬ টি ওয়ার্ডে সম্মেলন করেছে আহ্বায়ক কমিটি। সেইসব সম্মেলন ঘিরে ছিল বিতর্ক আর সংঘর্ষ!

এই যখন পরিস্থিতি তখন নগর যুবলীগের গৃহ বিবাদ প্রকাশ্য রুপ নিয়েছে। সর্বশেষ, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীসহ জাতীয় দিবসগুলোয় তিন চার ভাগে বিভক্ত হয়ে কর্মসূচী পালন করেছে নগর যুবলীগ। তাতে করে ৪৮ বছরের পুরানো এই সংগঠনের প্রতি নেতা-কর্মীদের দায়বদ্ধতা আর শৃঙ্খলাবোধের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। তবে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই নতুন কমিটি পাবে চট্টগ্রাম নগর যুবলীগ।

যদিও নগর যুবলীগ নেতাদের এখন সকল মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। তাদের অনেকেই চান দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে নেতাদের কাছে নিজেদের শক্তি সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে। কিন্তু কমিটি যখনই হোক, সেটা কোন প্রক্রিয়ায় হবে তা নিয়ে রয়েছে সন্দেহ। দীর্ঘদিন ধরে নতুন কমিটি না হওয়ায় যুবলীগে এখন সৃষ্টি হয়েছে নেতৃত্বের জট। যেন অভাব নেই নেতার!

কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এবার কমিটিতে জনমুখী, নিবেদিত, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, দলে অবদান রয়েছে ও দলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধদেরই সুযোগ দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে আগের কমিটিতে থেকে যারা বিভিন্ন বিতর্কিত কাজের সাথে যুক্ত হয়ে আলোচনায় এসেছেন তাদের নামের তালিকা করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এছাড়াও জানা গেছে, যেহেতু চট্টগ্রামে এবার অনেক নেতাই পদ প্রত্যাশী তাই আগামীর সম্মেলন ইলেকশন নাকি সিলেকশন কোন প্রক্রিয়ায় হবে সেটা নিয়ে সন্দিহান কেন্দ্র!

সদ্য ঘোষিত যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আদিত্য নন্দী নিউজনাউকে বলেন, অতীতে গুটিকয়েকের অপকর্মের বদমানের ভাগিদার হয়েছিল যুবলীগ। সেখান থেকে আমাদের নতুন কমিটির একবছর হতে চলছে। তবে করোনার কারণে স্বাভাবিক ভাবেই সব কিছু পিছিয়ে পড়ছে। চট্টগ্রামের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের কাজও থেমে আছে। পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলে শিগগিরই সেই প্রক্রিয়া চালু হবে।

৮৮ মাসেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে না পারার কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু নিউজনাউকে বলেন, আমরা সব সময় প্রস্তুত ছিলাম। কেন্দ্র নির্দেশ দিলেই সম্মেলন করবো। কিন্তু এই সময় জাতীয় নির্বাচন এবং আন্দোলন–সংগ্রামের মধ্যেই ছিল সংগঠন। এ ছাড়াও নগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন বিষয় আছে এবং কেন্দ্র থেকেই নির্দেশনা ছিল ওয়ার্ড কমিটি না করার। তাই পারা যায়নি।

নিজেদের মধ্যে দূরত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, আসলে কি বলবো? এগুলো পার্টি ফোরামে আলোচনা হওয়া উচিত। তাহলে সমাধান হতো। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি কারো সাথে বিরোধে যাইনি।

তবে আহ্বায়ক কমিটি প্রয়োজনীয় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমি শিগগিরই নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি চাই। যুবলীগের দায়িত্ব ছাড়তে চাই।

নতুন কমিটি প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সদস্য জাহাংগীর আলম নিউজনাউকে বলেন, সাত বছর আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই রাজনীতির ফলে স্থানীয় যুবলীগের কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। অনেকেই মহানগর কমিটিতে স্থান পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছেন। সময়মতো চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে চট্টগ্রামে যুবলীগের রাজনীতি আরও চাঙ্গা হতো।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুরজিৎ বড়ুয়া লাভু নিউজনাউকে বলেন, সাংগঠনিক নীতিমালা না মানায় দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন স্থবির। তৃণমূলের নেতারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। আর পিছনে ফিরে না তাকিয়ে কেন্দ্রীয় যুবলীগের নতুন নেতৃত্বের আহবানে দলীয় সভানেত্রীর হাতকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। সাবেক ছাত্রনেতা এবং বর্তমান যুবনেতাদের সমন্বয়ে দ্রুত নগর কমিটি করার দাবি জানান এই ছাত্রনেতা।

এই প্রসঙ্গে নগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এম আর আজিম নিউজনাউকে বলেন, দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের দায়িত্বে ছিলাম। নেতারা যোগ্য মনে করলে যুবলীগের দায়িত্বে আসবো। তবে ক্ষমতাসীন দলের তো সবাই প্রার্থী! যদি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কমিটি করা হয় তাহলে বর্তমান স্থবিরতা কাটবে।

চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন- নগর যুবলীগের যুগ্ম-আহবায়ক মাহবুবুল হক সুমন, সাবেক কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য দেবাশীষ পাল দেবু, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এম আর আজিম, সাবেক কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য আব্দুল মান্নান ফেরদৌস, কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুরজিৎ বড়ুয়া লাভু, আরশাদুল আলম বাচ্চু, আজিজুর রহমান আজিজ।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার কথা। ১৯৮৯-৯০ সালে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের ৬৭ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়েছিল, ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন নোমান আল-মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শফিকুল হাসান। এরপর ২০০৩ সালের জুলাই মাসে মহানগর যুবলীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়। কিন্তু কমিটি ঘোষণা নিয়ে সংঘর্ষের জেরে তা পণ্ড হয়ে যায়। এর দেড় বছর পর চন্দন ধরকে আহ্বায়ক ও মশিউর রহমানকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের জুলাইয়ে মহিউদ্দিন বাচ্চুকে আহ্বায়ক ও ফরিদ মাহমুদসহ চারজনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে আবারও ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় যুবলীগ। তিনমাসের সেই আহ্বায়ক কমিটি ৮৮ মাসে শেষেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি।

নিউজনাউ/পিপিএন/এনএইচএস/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...