সেবা নয়, বাণিজ্যমুখী হাসপাতাল

শাহরিনা হক আদর:

আমাদের চিকিৎসাসেবা এগোচ্ছে এ কথা যেমন সত্যি, এখনো অনেক বিষয়ে এই সেবা অনগ্রসর সেটাও অস্বীকারের উপায় নেই। জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, হাসপাতালের যে ঘাটতি রয়েছে এটা অজানা নয়। কিন্তু চিকিৎসাসেবা যে এতটা বাণিজ্যমুখী আমাদের, সেটা এই করোনাকাল না এলে বুঝতাম না আমরা।

অনগ্রসর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোটা পরিস্কার হয়ে চোখে ধরা দিলো। এখন চিকিৎসাসেবা সর্বজনীন হওয়ার কথা থাকলেও দেখলাম হাসপাতালগুলো চিকিৎসাবিমুখ। করোনায় আক্রান্তরা যেমন পরীক্ষা আর চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন, তেমনি চিকিৎসা পাওয়ার আশায় ছুটে মরছেন অন্যান্য জটিল রোগীরাও।

প্রথমের চিত্র ছিল এমন- চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক-পিপিই ও অন্যান্য সামগ্রীর অভাবের অজুহাতে সেবা দেওয়া হচ্ছে না। এখন করোনা পরীক্ষার রেজাল্ট ছাড়া চিকিৎসা দিচ্ছে না। আর ভর্তি হলে চিকিৎসা খরচের নামে অতিরিক্ত বিল চাপানো হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ অনেকখানেই বহু বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠছে।

সবারই আশা ছিল সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসায় ব্রতী হবে। করোনার সংক্রমণ বাড়ায় সরকার ঈদের আগেই দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা চালুর নির্দেশ দেয়। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নির্দেশনার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিনই চিকিৎসায় ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা না দিলে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেয় সরকার। কিন্তু কিছুতেই পরিবর্তন আসেনি। উপর দিয়ে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে পরিস্থিতি বদলায়নি।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো যে বাণিজ্যমুখী আচরণ করছে, সে কথা নিজেও বলেছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা মহামারীতে সেবা না দিয়ে বাণিজ্যমুখী আচরণ করছে জানিয়ে তিনি বলেন এটা খুবই দুঃখজনক। বেসরকারি হাসপাতাল করোনা রোগীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে আসা প্রয়োজন ছিলো, সেভাবে আসেনি।

অনেকগুলো হাসপাতাল নিজেরাই অনেকটা বন্ধ করে রেখেছে। সেখানে কোনো করোনারোগী গেলে সেবা দেওয়া তো দূরের কথা, তাকে অন্য কোথাও ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিছু বেসরকারি হাসপাতালের এ আচরণ অমানবিক। হাসপাতালের উদ্দেশ্য যদি বাণিজ্য হয়, তাহলে তাকে হাসপাতাল বলা কঠিন।

তিনি বলেন, আমরা দেখছি, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো হাসপাতালকে যখন ভাড়া নেওয়া কথা বলা হয়, তখন অস্বাভাবিক অর্থ দাবি করা হয়।

তিনি জানান, ২০০ বেডের একটি হাসপাতাল মাসে ১৭ কোটি টাকা দাবি করেছে, এবং একই সঙ্গে ডাক্তার-নার্সদের থাকা-খাওয়ার টাকাও দাবি করেছে।

এই সময়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো বাণিজ্যের মানসিকতা পরিহার করে সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবে-আশাপ্রকাশ করে ড. হাছান মাহমুদ।

মহামারীকালে কোনোভাবেই যেন করোনার চাপে অন্য রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন সে বিষয়ে বারবার সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। কেননা, এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়া এবং বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সমন্বয়ের কথা আমরা শুনে আসছি অনেকদিন ধরেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সম্পর্কিত বিভাগের কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোকে যুক্ত করতে কয়েক দফা মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও ক্লিনিকের মালিকদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে গাইডলাইন তৈরি করবে। প্রশ্ন হলো, গাইডলাইন তৈরি করতে কদিন লাগবে আর সেই গাইডলাইন অনুসারে কবে হাসপাতালগুলো তদারকির আওতায় আসবে তাও জানা নেই।

শুধু সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্য প্রণোদনা এবং বীমার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি ও প্রাইভেটে কাজ করেন এমন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কোনো প্রণোদনা না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন অনেকেই।

এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে তেমনি বেসরকারি হাসপাতালের মালিকদেরও অতিরিক্ত মুনাফার চিন্তা ছেড়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে হয়ত সমাধান সম্ভব।

নিউজনাউ/এসএইচ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...