বাড়ছেই অক্সিজেনের জন্য হাহাকার

শাহরিনা হক আদর:

দেশে যে হারে প্রতিদিন করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, তাদের চিকিৎসায় হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। করোনার সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকায় সাধারণ নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে হাসপাতালগুলো। তার মধ্যে বড় একটি সংকট চলছে অক্সিজেনের। যতদূর জানা গেছে, দেশের বেশিরভাগ হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম নেই।

রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্টে হাইফ্লোঅক্সিজেন প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোতে সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। রোগীরাও অক্সিজেন পাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। কোনো হাসপাতালে আবার রোগী রেখে স্বজনরা ছুটছে অক্সিজেন যোগাড় করতে। না পেরে নিজেরা অক্সিজেন কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে, বিপাক বাড়াচ্ছেও। এমনও শোনা গেছে যে করোনা হোক বা না হোক, আগেই অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে বাড়িতে রাখছে অনেক। ফলে দাম বেড়ে যাচ্ছে, প্রয়োজনের সময় অন্যরা অক্সিজেন পাচ্ছে না।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অক্সিজেন প্রস্তুতকারী আন্তর্জাতিক কোম্পানি লিন্ডে। গণমাধ্যমকে তারা জানায়, অক্সিজেনের চাহিদা বর্তমানে এতটাই বেড়েছে যে, তারা সরবরাহ করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না।

হাসপাতাল সূত্র জানাচ্ছে, একসঙ্গে অনেক রোগী সামলাতে অক্সিজেন নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হয় রোগীদের। করোনা সংক্রমণের প্রথমদিকে চাহিদা মতো অক্সিজেন পাওয়া গেলেও ঈদের পরে রোগী বেড়েছে, সিলিন্ডারের ঘাটতি বেড়েছে। সমস্যা আরও আছে, এই সিলিন্ডার বহনেও নানা সমস্যা। রোগীদের কাছে সবসময় ওয়ার্ড বয় ও নার্সরাও থাকছে না। ঠিক এই সমস্যাগুলোর কারণে হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতেই ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা। সিলিন্ডার কিনে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকার একজন বাসিন্দা, তিনি এমনিতেই শ্বাসকষ্টের রোগী। পঞ্চাশোর্ধ এই ব্যক্তিটির করোনা ধরা পড়ার পরে হাসপাতালে ভর্তিতে দেরি হচ্ছিলো। হঠাৎ রাতে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলে স্বজনরা ছুটতে থাকেন অক্সিজেনের জন্য। অনেক ছোটাছুটির পর দ্বিগুণ দামে কিনতে হয় সিলিন্ডার। এই অবস্থা দেখে তার আশেপাশে কেউ কেউ আগাম সিলিন্ডারও কিনে রেখেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখার সংগৃহীত সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, দেশের মাত্র ৫৭টি জেলা হাসপাতালে অক্সিজেন টিউব আছে। আর মাত্র ১০ শতাংশ হাসপাতালে আছে এবিজি (আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস এনালাইজার)। দুই-তৃতীয়াংশ হাসপাতালে পালস অক্সিমিটার রয়েছে। সব জেলা হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকলেও মাত্র ১০ শতাংশ হাসপাতালে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আছে। দেশের ৫৩ শতাংশ হাসপাতালে নেজাল ক্যানোলা এবং দুই-তৃতীয়াংশ হাসপাতালে অক্সিজেন মাস্ক রয়েছে। এ ছাড়া দেশের ৫৮টি জেলার মধ্যে ১৬টি জেলা হাসপাতালের কোনো বিভাগে একটিও পালস অক্সিমিটার মেশিন নেই। মাত্র ছয়টি হাসপাতালের বহির্বিভাগে পালস অক্সিমিটার আছে। মাত্র নয়টি হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক বিভাগে, পাঁচটি জেলা হাসপাতালের সাধারণ বিভাগে, ৩১টি জেলা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে, তিনটি জেলা হাসপাতালের আইসিইউতে পালস অক্সিমিটার মেশিন রয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকার পর চিকিৎসায় ব্যবহৃত দরকারি বিভিন্ন সামগ্রী যেমন অক্সিমিটার, পোর্টেবল অক্সিজেন ক্যান, পোর্টেবল ভেন্টিলেটর, ফেস-শিল্ড এমনকি অক্সিজেন সিলিন্ডারের বিক্রি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

অক্সিজেন সিলিন্ডার হোম ডেলিভারিরও ব্যবস্থা রয়েছে, এপ্রিল থেকে সেখানেও চাহিদা বেড়েছে। মে মাসে সেটা ভয়াবহরূপ নেয়। সেখানেও চলছে উচ্চমূল্যের ব্যবসা।

বাড়তি মূল্যের কারণে কিনতে না পেরে কেউ কেউ ভাড়ায় নিচ্ছেন অক্সিজেন সিলিন্ডার। অক্সিজেন সিলিন্ডারের পাশাপাশি পোর্টেবল অক্সিজেন ক্যান ও দেহের অক্সিজেন লেভেল পরিমাপের জন্য পালস অক্সিমিটার নামের ছোট একটি যন্ত্রও অনলাইনে ভালো বিক্রি হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অক্সিজেন সিলিন্ডারের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারে প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্বাসকষ্ট হলেই অক্সিজেন নেওয়ার প্রয়োজন নেই- এটা মানুষ না জেনেই নিজেদের মতো ব্যবহার করছে যেটা অবশ্যই ক্ষতিকর। প্রয়োজন বা হুজুগ যাই হোক, অক্সিজেনের এই হাহাকার ক্রমেই বেড়েই চলেছে দেশে।

নিউজনাউ/এসএইচ/২০২০

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...