দশ বছরেও সরেনি পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম

এনএইচ সাগর: দীর্ঘ দশ বছরেও পুরান ঢাকা থেকে সরেনি রাসায়নিক গুদাম। এসব অবৈধ রাসায়নিক গুদামগুলোর কারণেই নিমতলী ও চুড়িহাট্টা ট্রাজেডির মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর জন্ম হয়েছে। নিমতলী ও চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় দুইশ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরপরই এসব এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে কেরানীগঞ্জ নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিলো কিন্তু সেটা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। আট বছর পর যখন চুড়িহাট্টার ঘটনা ঘটলো তখন এই দাবি ও উদ্যোগ আবার কিছুটা নড়াচড়া দিয়ে উঠেছিলো। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল থেকে সিদ্ধান্ত হলো এসব গুদাম স্থানান্তর করা হবে মুন্সিগঞ্জে। সিদ্ধান্ত হলেও তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। সচেতন মহল মনে করছেন রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই সরছে না এসব গুদাম ও কারখানা।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার রাসায়নিক এবং প্লাস্টিকের কারখানা ও গুদাম আছে। অগ্নিকাণ্ডের পর তাৎক্ষণিকভাবে অস্থায়ী ভিত্তিতে চকবাজারের কয়েকশ রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বাকি গুদামগুলো এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে পূর্বের জায়গায়।

২০১০ সালের নীমতলী ট্রাজেডিতে প্রাণ যায় ১২৫ জনের।

জনজীবনের নিরাপত্তার জন্য এসব গুদাম ও কারখানা এতটা হুমকি হওয়া সত্ত্বেও কেন এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে দশ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি? এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটা কোনো বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। দীর্ঘ দিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ এবং এই ধরনের সমস্যা হলে তারপর কিছু তদন্ত কমিটি হয়, কিছু সিদ্ধান্ত হয় এবং সেগুলো আর কোনো দিন বাস্তবায়ন হয় না। মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে পুরাণ ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো সরানো যাচ্ছে না। প্রশাসনিক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যোগসাজশমূলক ব্যর্থতাও রয়েছে। শুধুমাত্র ব্যর্থতা নয় এরা যোগসাজশে ব্যাপারগুলোকে ব্যর্থতায় পরিণত করে। এই যোগসাজশে থাকে ব্যবসায়ী মহলের একাংশ, যাদের অর্থ ও প্রভাব আছে। ব্যবসায়ী মহলের থেকে অর্থ গ্রহণ ও প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে নিশ্চুপ থাকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বা প্রসাশন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরোও বলেন, এক্ষেত্রে যারা রক্ষকের ভুমিকায় আছেন তারাই ভক্ষকে পরিণত হয়েছেন। যে কারণে পুরান ঢাকা থেকে এখনো এসব গুদাম ও কারখানা সরানো সম্ভব হয়নি এবং নিমতলী ও চুড়িহাট্টার মতো ঘটনা বার বার ঘটতে থাকবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসব স্থানান্তরের ব্যাপারে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেগুলো অবজ্ঞা করা হচ্ছে।

এসব বিষয় নিয়ে টিআইবির গবেষণা আছে জানিয়ে ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন,সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে যারা গুদাম ও কারখানা সরাতে চাইছেন না তারা একটা যুক্তি দেখান যে , দীর্ঘ দিনের একটা ব্যবসা এখান থেকে সরিয়ে নিলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে। আসলে সরকার এসব স্থানান্তরের জন্য জন্য সুযোগ করে দিলেও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কিছু মানুষের কারনেই এগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যে কারনে দীর্ঘ সময় পেড়িয়ে গেলেও পুরাণ ঢাকা থেকে সরানো যাচ্ছে না রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা।

২০১৯ সালে নীমতলী ট্রাজেডিতে প্রাণ হারান ৭০ জনেরও বেশি মানুষ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুড়িহাট্টারর ঘটনার পর বেশ কিছু কারখানা ও গুদাম পুরাণ ঢাকা থেকে সরিয়ে কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া ঘাট এলাকায় নেয়া হয়েছে। তবে সেখানেও মানা হচ্ছে না সঠিক নিয়ম ও নির্দেশনা। কেরাণীগঞ্জের অনেক ভবন মালিক মোটা অঙ্কের অর্থের লোভে, অতিরিক্ত অগ্রিম ও ভাড়া পেয়ে কোনো নিয়ম নীতি অথবা ঝুঁকির তোয়াক্কা না করেই আবাসিক এলাকার মধ্যেই তাদের জায়গা কেমিক্যালের গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেয়। যার কারণে গত বছর কেরাণীগঞ্জের পূর্ব বন্দ ডাকপাড়া এলাকায় রাসায়নিক কেমিক্যালের গুদামে ভয়ানক বিস্ফোরণ ঘটনা ঘটেছে।

কারখানা ও গুদামগুলো সরানোর সিদ্ধান্ত কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না এ ব্যাপারে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আলী আজমের সাথে। তবে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

টিআইবি তাদের এক গবেষণায় দেখিয়েছে অগ্নি নিরোধে সরকারি সব নির্দেশকের ক্ষেত্রেই সুশাসনের ঘাটতি ছিলো। যার কারণে পুরান ঢাকায় নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর চুড়িহাট্টা দুর্ঘটনার পুনরাবত্তি ঘটেছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা প্রতিপালন না করার পাশাপাশি আদালতকেও অবমাননা করেছে। তদন্ত কমিটি ও টাস্কফোর্সের সুপারিশ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতার জন্য এবং আদালত অবমাননাকারী দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে বলে মনে করে টিআইবি।

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...