ঘোর সংকটে প্রকাশনা শিল্প, ক্ষতি প্রায় ৪০০ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জ্ঞানবিকা‌শের প্রধান মাধ্যম বই। আর এই বই প্রকাশ শুরু হয় সিপা‌হি বি‌দ্রো‌হের সময়। ১৮৬০ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম সাহিত্যপত্র প্রকাশ করেন হরিশচন্দ্র মিত্র। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে পাঠক শ্রেণী তৈরি ও বাংলা বই প্রকাশনা বিকাশের লক্ষ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে যাত্রা শুরু করে বাঙালির প্রাণের বইমেলা উৎসব। ধী‌রে ধী‌রে বে‌ড়ে‌ছে মেলার প্রসার, পাঠক শ্রেণীর সংখ্যা। সেই সা‌থে দেড়‌শো বছ‌রে প্রকাশনা সংস্থায় প্রকাশক হিসে‌বে নাম লি‌খি‌য়ে‌ছে অনেকে।

সারাবি‌শ্বের ম‌তো বাংলা‌দে‌শেও ক‌রোনাভাইরা‌সে সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থে‌কে অন্যান্য পেশার ম‌তো খেই হা‌রি‌য়ে‌ছে প্রকাশনা শিল্পও।

গে‌লো মার্চ থে‌কে দেশজু‌ড়ে লকডাউন হওয়ার পর থে‌কে বন্ধ ছি‌লো বই বিকিকিনির সংখ্যা। ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি শেষে গত ৩১ মে খু‌লে দেওয়া হয় প্রকাশনা সংস্থাগুলো। ত‌বে শোরুম খুললেও বিক্রি নেই বল‌লেই চ‌লে। অনলাইনেও নেই আশানুরূপ বই বিক্রি। বই‌ বি‌ক্রি না থাকায় এ শি‌ল্পে যে প‌রিমাণ ক্ষ‌তি হ‌চ্ছে তার আ‌র্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

কো‌ভিড-১৯ এর কার‌ণে দে‌শের প্রকাশনা সংস্থার অবস্থা সম্প‌র্কে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ নিউজনাউকে জানান, করোনা সংক্রম‌ণের কথা যখন থে‌কে জানা যায়, তখন থে‌কেই বই বি‌ক্রি একপ্রকার বন্ধ। কারণ নি‌র্দিষ্ট চা‌হিদা পূর‌ণের প‌রেই মানুষ বই কিনতে আ‌সে। এ‌ই মহামা‌রীর সংক‌টে এখন সবাই সী‌মিত জীবনযাপ‌নে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা কর‌ছে। অ‌নে‌কে ব্যবসা হা‌রি‌য়েছে, অ‌নে‌কের বেতন ক‌মে গে‌ছে। এ অবস্থায় বই‌কেনার কথা মাথায় না আসাটা স্বাভা‌বিক। যার প্রভাব প‌ড়ে‌ছে প্রকাশনা শি‌ল্পের ওপর।

সৃজনশীল প্রকাশনা শি‌ল্প এখ‌নো সেভা‌বে উন্ন‌তির দি‌কে পৌঁছায়নি। আর এমনিতেও সবাই যে বই কেনেন তা নয়। যারা কিনতো তারাও ক‌রোনাকা‌লে বই‌য়ের দোকা‌নে আস‌ছেনা, এমনটাই জানান বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির যুগ্মনির্বাহী পরিচালক এবং অন্বেষা প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেন।

নালন্দার সত্ত্ব‌াধিকারী রেদওয়ানুর রহমান ব‌লেন, এই ক‌রোনাপ‌রি‌স্থি‌তিতে আমা‌দের প্রতিমাসে ক্ষ‌তি হ‌য়ে‌ছে ৬৫ হাজার টাকার ম‌তো। এখন বাধ্য হ‌য়ে বন্ধ ক‌রে দেওয়া লাগ‌ছে নালন্দা বুক ক্যা‌ফে।

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের অন্যতম স্বত্বাধিকারী আদিত্য অন্তরের মতে, করোনাকালে প্রকাশনা শিল্পের ব্যবসা ক‌মে‌ছে ৯০ শতাংশ। তি‌নি জানান, অনলাইনে বই বিক্রি এখন প্রকাশনা খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক। অনেকেই অনলাইনে অর্ডার করে বই কিন‌লেও, করোনার সময়ে অনলাইনে বই বিক্রিও দুইমাস বন্ধ ছিল। এখনও যে খুব বিক্রি হচ্ছে না, তা না।

ত‌বে, দেশের অনলাইনে বই বিক্রির সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান রকমারি’র হেড অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড ইনবাউন্ড মার্কেটিং মাহমুদুল হাসান সাদি জানান, মে মাসের শেষ সপ্তাহে অফিস খোলার পর জুনের ৫ তারিখ থেকে আমাদের কার্যক্রম শুরু করি। এর পর থেকে যা বিক্রি হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট।

প্রকাশনা সংস্থা বাতিঘর প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গত ১৯ এপ্রিল থেকে অনলাইনে বই বিক্রি শুরু করেছে। এ বিষয়ে এর কর্ণধার দীপংকর দাস বলেন, অনলাইনে বই বিক্রি হচ্ছে। সংখ্যাটা অনেক না হলেও, হতাশজনক নয়।

প্রতিবছরই বইমেলার পরের দুই মাসে মেলার নতুন বইগুলো ঢাকার বাইরে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকেন প্রকাশকরা। কিন্তু করোনার কারণে এবার এ প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ বন্ধ। এ বিষ‌য়ে, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত আমাদের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা হাতছাড়া হয়েছে। যার ফলে অনেক প্রকাশকই এখন খুব খারাপ অবস্থায় আছেন।

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের আদিত্য অন্তর জানান, প্রতি বছর এসময় আগামী মেলার অর্ধেক কাজ হয়ে যায়। কিন্তু এবার শুরুই করিনি।

প্রকাশনা শি‌ল্পের এমন সংক‌টে সরকা‌রের সাহায্য নয় বরং সহ‌যো‌গিতা চান প্রকাশকরা। এমন‌কি সেটা স্বলমেয়া‌দে ঋ‌ণের মাধ‌মে হ‌লেও মন্দ হ‌বে না। এ‌তে অনেক প্রকাশকই ঘু‌রে দাঁড়া‌তে পার‌বে। টি‌কে থাকবার লড়াই শুরু কর‌তে পার‌বে সৃজনশীল এ শিল্প‌টি।  সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা যদি সঠিক নিয়ম মেনে বই কেনে, তাহলে আমরা এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ করতে পারব ব‌লে জানান, প্রকাশকরা।

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...