ইউনিপে টু ইউ’র নতুন সংস্করণ ‘সিল সিটি’

বিশেষ প্রতিনিধি: দশ মাসে দ্বিগুণ লাভ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ২০০৯ সালে কথিত এমএলএম ব্যবসা শুরু করেন ইউনিপে টু ইউ। ৬ লাখ বিনিয়োগকারীর ৬ হাজার কোটি টাকা গায়েব করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। গ্রাহকরা সে টাকা এখনো ফেরত পাননি। একই পদ্ধতিতে নতুন ধরনের প্রতারণার কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করেছে ‘সেবা আইডিয়াস অ্যান্ড লিভিং লিমিটেড’ নামে একটি কথিত আবাসন কোম্পানি।

জমিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এক বছরেই বিনিয়োগ দ্বিগুণ করার অফার প্রতিষ্ঠানটির। রাজধানীর উত্তরায় বিলাসবহুল অফিস খুলে দেড়শ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পায়তারা করছে তারা। এমএলএম ঘরানার প্রতিষ্ঠানটির মূল টার্গেট অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী।

‘সিল সিটি’ নামে কথিত আবাসন প্রকল্পের গল্প শুনিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে সেবা আইডিয়াস অ্যান্ড লিভিং লিমিটেড। দক্ষিণখানের শেষ প্রান্ত কাচকুরা বাজারের পাশে মাইয়া গ্রামের জলাশয়ে টাঙানো হয়েছে সিল সিটির সাইনবোর্ড। সেখানে তাদের বেশ কয়েকটি সাইনবোর্ড থাকলেও কোনো জমি কেনা নেই প্রতিষ্ঠানটির নামে। ভাড়ার জমিতে টাঙানো হয়েছে এসব সাইনবোর্ড।

সেবা আইডিয়াস অ্যান্ড লিভিং লিমিটেড কর্তৃপক্ষের দাবি, আমাইয়া মৌজায় এরইমধ্যে সাড়ে ৬ বিঘা কিনেছে তারা। বায়না করা হয়েছে ৫০ বিঘা জমির। যদিও সরেজমিনে সেসবের কোনো সত্যতা মেলেনি।

তাদের কর্পোরেট কার্যালয়ও বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত। উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়ি। সরাসরি কেউই ঢুকতে পারে না সেখানে। শুধুমাত্র গ্রাহকদের জন্যই প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। গ্রাহক পরিচয়ে এই প্রতিবেদকের সেখানে দেখা হয় সেবা আইডিয়াস অ্যান্ড লিভিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী নুরুল ইসলামের সঙ্গে। কাজী নুরুল ইসলাম এর আগেও ইউনিপে টু ইউসহ বিভিন্ন এমএলএম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি তুলে ধরেন সিল সিটির বছরে বিনিয়োগ দ্বিগুণ করার লোভনীয় প্রস্তাব।

তিনি বলেন, সিল সিটিতে তিন কাঠার প্লটের দাম ৭৫ লাখ টাকা। আর ১,৩০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের দাম ৬৫ লাখ টাকা। কথিত এই প্লট ও ফ্ল্যাটের বিপরীতে বিনিয়োগ করার সুযোগ দিয়ে থাকে তারা। তবে যারা এককালীন এত টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন না তাদের জন্য রয়েছে শেয়ারের ব্যবস্থা। লাখ প্রতি বছরে লাভ ৮ হাজার ৪৫০ টাকা লাভ এবং দুবছর পর মূল টাকা ফেরত নিতে পারবেন গ্রাহক। অধিকাংশ গ্রাহক ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে থাকে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীদের সেখানে নিয়ে যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি ১০ শতাংশ হারে পান কমিশন। প্রতি মাসে ৮ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়ার ব্যাখার দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা।

প্রতিষ্ঠানটির কাছে অনুমোদনসংক্রান্ত নথিপত্র চাওয়া হলে তারা একটি যা হাজির করেন, তা স্রেফ একটি ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি। রাজউক অথবা জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন নেই; নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র।

ওই অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লভ্যাংশের প্রলোভন আসলে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। বিনিয়োগের টাকাই কেউ ফেরত পান না, লাভ তো দূরের কথা।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, গত দেড় বছর ধরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। বিনিয়োগের পরিমাণ এরইমধ্যে ছাড়িয়েছে একশ কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। সারাজীবন চাকরি করে শেষ সম্বল পেনশনের টাকা তুলে দিচ্ছে প্রতারক এই প্রতিষ্ঠানটির হাতে।

বিনিয়োগকারীদের প্রতিদিনের টাকার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দালালের জন্য কমিশন হিসেবে রেখে বাকি টাকা ভাগ করে নেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

সেবা আইডিয়াসের এমডি কাজী নুরুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি সরাসরি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছার কথা জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আলম সিদ্দিকী জানান, বিষয়টি তাদের জানা নেই। তবে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। তথ্যসূত্র: আমাদের সময়।

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
এছাড়া, আরও পড়ুনঃ
Loading...