Banner Before Header

কুমিল্লার কিশোর কিশোরীদের স্মার্টফোন আসক্তি

কুমিল্লার কিশোর কিশোরীদের স্মার্টফোন আসক্তি
প্রণব মজুমদার

প্রাণের শহর আমার কুমিল্লা। ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি এ কুমিল্লাকে ঘিরে। আমাদের আদি বাড়ি ছিলো অবিভক্ত ত্রিপুরায় এ শহরে। কুমিল্লার সন্তান বলে এখনও গর্ববোধ করি। কি ছিলো না আমাদের কুমিল্লায় ? মানুষের মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও বাসস্থান প্রতিটি ক্ষেত্রে কুমিল্লা স্বয়ংসম্পন্ন ছিলো। কিন্তু আজও কি সেই ইতিবাচক দিকগুলো আমরা ধরে রাখতে পেরেছি ?
মাটির টানে কুমিল্লায় প্রায় সময়ই যাওয়া হয়। আত্মীয় স্বজন ও প্রিয়জনদের সামাজিক নানা অনুষ্ঠান ও পেশাগত কাজে যেতে হয় কুমিল্লা শহরে বা শহরের আশে পাশে।
৫ বছর ধরে কুমিল্লাকে ঘিরে যে বিষয়টি আমার চোখে পড়েছে তা হলো কিশোর কিশোরীদের স্মার্টফোনের প্রতি প্রবল আসক্তি ! কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সন্তানদের ? তথ্য প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রসমান বিশ্বে ১৯৯৩ সালে স্মার্টফোন বাংলাদেশে প্রবেশ করে। দিবারাত্রি পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থায় রাজধানী থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের এ শহরে যে কোন পণ্য সামগ্রী দ্রুততম সময়ে বাজারজাত হয়। অন্য জেলা শহরগুলোর চেয়ে কুমিল্লার ভোক্তারা পণ্যদ্রব্য উপযোগে বিলাসী ও সামর্থ্যবান। কিন্তু অতিশয় ভোগ আমাদের জীবনের মৌলিক সত্তাকে বিনাশ করে দিচ্ছে!
কুমিল্লা শহর এখন দীঘির শহর নেই। রিকশার শহর নয়। শহরে খেলার মাঠ দেখি না। মাছিময় সারি সারি মিষ্টির দোকান দেখা যায় না কুমিল্লায়। নেই সুপারি ও নারকেল গাছের শহর। প্রাকৃতিক বাতাসের আনন্দে এখন কারো মন দোলে না। সাংস্কৃতিক, সামাজিক, শিশু ও নাট্য সংগঠনের শহর কোথায় কুমিল্লা ?
বড় বড় ইমারতের শহর কুমিল্লা, শীততপ নিয়ন্ত্রিত চকচকে বিপনী বিতানের আজকের কুমিল্লা শহর! ধুলোবালির বিভাগীয় শহর! ফার্স্টফুড ও বিদেশী খাবারের রেঁস্তোরায় ভরপুর কুমিল্লা। শহর আজ সাজসজ্জা ও ভোগ্যপণ্যের ! স্মার্টফোনের শহর এবং ফেসবুক, ইমো, ভাইভার, হোয়াটস আপ ও ইনস্টিগ্রাম ইত্যাদি অ্যাপসের নগর কুমিল্লা! অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকতায় আমার শহর কুমিল্লা আজ ঢাকা। প্রাণ হারিয়ে গেছে!
ভারী কষ্ট হয় যখন শহরের কিশোর কিশোরীদের দেখি দামী একাধিক স্মার্টফোন হাতে। কানে হেডফোনের তারে রাস্তা পার হয়। শহরের ফার্স্টফুড ও বিপনী বিতানগুলোতেও একই চিত্র।
রমজান শুরু হওয়ার ক’দিন আগে এক সন্ধ্যায় শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় ইয়াম্মি ইয়াম্মি খাবার দোকানে আমরা। ছোট বোনের ছেলেমেয়েদের নিয়ে স্যুপ ও অনথন খেতে গিয়েছি। লক্ষ্য করলাম পাশের টেবিলগুলোতে বিরিয়ানি ও আইসক্রীম খাচ্ছে কেউ কেউ। তারা সবার বয়সই ১২ থেকে ১৫! অনেকের কানেই হেডফোন। পাশের টেবিলে ২ জোড়া কিশোর কিশোরী। আনন্দঘন অবস্থায় বসেছে ওরা। সেলফি রোগে আক্রান্ত ওরা! বিয়ে বাড়ীর হইচই আমেজে মুশগুল ওদের দেখে মনে হলো দোকানটা ওদের। কিশোর বয়সের আমার ভাগিনীদেরও স্মার্টফোনে সেলফি তোলার রোগ বিদ্যমান। এখানেও তাই হলো -ক্লিক ক্লিক! বোনের বাসায় একাধিক অ্যান্ড্রোয়েট সেলফোন রয়েছে। ওয়াইফাই সংযোগে স্মার্টফোনের সুবাদে ফেসবুক, ইমো, ভাইভার, হোয়াটস আপ ও ইনস্টিগ্রাম ইত্যাদি অ্যাপসের সব প্রোগ্রামই ওদের মুখস্থ।
কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন মনোহরপুর উষা মার্কেটের পিছনে পরিচিত এক ভদ্রমহিলার বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। ভদ্রমহিলা ও স্বামী দু’জনেই চাকরিজীবী। স্বামী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং মহিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ৩ সন্তান তাদের। বড়টা ছেলে আর বাকী দু’জন মেয়ে। ছেলে পড়ে ইউসুফ হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে। মেয়ে বড়টা শৈলরাণী বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে। ছোটটার বয়স হয়নি স্কুলে যাবার। ভদ্রমহিলা বেশ উদ্বিগ্ন ছেলেমেয়েদের নিয়ে। কাউকেই স্মার্টফোনের অত্যধিক ব্যবহার থেকে নিবৃত্ত করতে পারছেন না। তবে ছেলেকে নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা তাদের। ছেলে তার কক্ষে বেশির ভাগ সময় স্মার্টফোন নিয়েই পড়ে থাকে। সেদিন সন্ধ্যায় ছেলে বাসায় ছিলো না। মেয়ে দু’জনই ব্যস্ত স্মার্টফোন নিয়ে। ব্যাংকার ভদ্রলোক বললেন, আজকালকার ছেলেমেয়েদের কি অভ্যাস হয়েছে! রাত জাগে ওরা, সকালে ঘুমায়। তাদের ছেলেও তাই! কুমিল্লায় এই স্মার্টফোন আর ফেসবুক কিশোর কিশোরীদের শিক্ষাক্ষেত্রে বেশ অধঃপতনে নিয়ে যাচ্ছে স্যার! টিনএজারদের লোভনীয় উপহার এখন বই নয়, স্মার্টফোন। কিশোর কিশোরদের ভ্রাম্যমাণ এ স্মার্টফোনের অতি প্রীতি শিক্ষামুখী কুমিল্লাকে নীচের অবস্থানে নিক্ষিপ্ত করছে! বেশি করে এ নিয়ে লিখুন স্যার ! বললাম, সন্তানদের নির্বিঘœ পড়াশুনার জন্য গৃহে এ ফোন ব্যবহার বন্ধ করে দেয়াই আপনার বিরাজমান সমস্যার সমাধান।
ঝাউতলার বন্ধু মারুফের পতœী সুমাইয়া। কুমিল্লা শহরে কিশোর কিশোরীদের স্মার্টফোন ব্যবহার প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠনের সাম্প্রতিক এক গবেষণা। সে সম্পর্কে জানালেন তিনি। গবেষণায় যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা খুবি হতাশাব্যঞ্জক। স্মার্ট বা অ্যান্ড্রোয়েট ফোন ব্যবহারকারী কুমিল্লা শহরের পৌর এলাকার গবেষণায় দেখা গেছে, ১০- ১৫ বছর বয়সের ২৫ জন কিশোর কিশোরীদের মধ্যে ২২ জন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে। বয়স বাড়িয়ে তারা ফেসবুকে একাউন্টধারী। এ ২২ জনের নামে বেনামে একাধিক একাউন্ট রয়েছে। পড়াশোনার চেয়ে এরা বেশি মনোযোগী ফেসবুক এবং স্মার্টফোনের নানা অ্যাপস ব্যবহারে। শহরের নজরুল এভিনিউস্থ একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী সাক্ষাৎকারে বলেছে, তার শ্রেণির ১০-১২ জন ছাত্র প্রতিনিয়ত স্মার্টফোন সেট ব্যবহার করে। শ্রেণি বিরতি বা টিফিনের সময় লুকিয়ে লুকিয়ে তারা এ ফোনে কথা বলে এবং খারাপ ছবি দেখে। অন্যদের দেখতে উৎসাহিত করে।
কুমিল্লার শহর এবং শহরতলীর অধিকাংশ বাসা এবং বাড়ীতে শিশু কিশোর ও কিশোরদের স্মার্টফোনের ব্যবহার আধিক্য পর্যবেক্ষণ করেছি। যেখানেই গিয়েছি সেখানেই অভিভাবকদের একই অভিযোগ। স্মার্টফোন থেকে কোমলমতি অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের রক্ষা করুন।
কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এর একজন কর্মকর্তা বললেন, এ শিক্ষা বোর্ডে ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে অষ্টম শ্রেণির জেএসসি’র (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট) ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে! তিনি মনে করেন স্মার্টফোন এবং এর নানা প্রোগ্রামে এ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অধিক সময় ব্যয় করা বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ।
তিনি জানালেন, জিএসসিতে এ বোর্ড ’১৫ সালে ২০৭৪৭ জন ছাত্র ছাত্রী জিপিএ -৫ পেয়েছিলো, ’১৬তে তা কমে দাঁড়ায় ১৯১৮৬ জনে। ২৯ ডিসেস্বর ঘোষিত কুমিল্লা বোর্ডের ২০১৭ সালের জিএসসি ফলাফল খুবই খারাপ ছিলো। মাত্র ৮ হাজার ৮৭৫ জন জিপিএ -৫ পায়। গত ৩ বছরে এ ক্ষেত্রে প্রতি বছরই এ বোর্ডে পাশের হার কমেছে।
শিক্ষায় কুমিল্লাবাসীর একটি সুনাম আজও শুনি। প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে হলে সন্তানদের শিক্ষা অর্জন করাতে দ্বিধা করে না কুমিল্লার মানুষ। কিন্তু কুমিল্লার ছেলেমেয়ে বিশেষ করে কিশোর বয়সের সন্তানদের মাত্রারিক্ত স্মার্টফোনের আসক্তি থেকে না ফিরালে শিক্ষায় উন্নত আমাদের কুমিল্লাকে পুণরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সামনে অভিভাবকদের স্মার্টফোন ব্যবহার না করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভ্রাম্যমাণ আলাপন যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। তাই সময় এসেছে গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি নিয়ে ভাবার। কুমিল্লার মানুষ হিসেবে আমাকেও বিযয়টি উদ্বেলিত করছে।

লেখক সাহিত্যিক, দৈনিক শিরোনাম এর ঢাকা ব্যুরো প্রধান এবং পাক্ষিক অর্থকাগজ এর সম্পাদক
reporterpranab@gmail.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.