Banner Before Header

হায়রে অভাগা মফস্বলের নাট্যকর্মী : অভিজিৎ সেনগুপ্ত

আমি সাধারণত ফেইস বুকে তেমন লিখি না। না লিখার পেছনে তেমন কোন কারণ নেই। আজ একটু লিখতে ইচ্ছে করল তাই লিখছি।

আজকের বিষয় বাংলাদেশের নাটক। বাংলাদেশের নাটক বলতে কি শুধু ঢাকার নাটক এবং নাট্যকর্মী? আমি এই সহমতের সাথে দ্বিমত পোষণ করি।এটি সত্য কথন না । এবং না করার পেছনে অনেক যুক্তিসঙ্গত কারণ বিদ্যমান।

বাংলাদেশের নাটক বলতে হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর, সিলেট , বগুড়া,বরিশাল, সিরাজগঞ্জসহ সকল জেলা শহর এবং উপশহরের নাটককে বুঝায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল যারা নাটক বিষয়ে লেখেন বা বলেন তারা প্রায় সকলেই সচেতনভাবে এই বিষযটি এড়িয়ে যান। এমনকি সাধারণ আলোচনায়ও এই বিষয়ে পাশ কাটিয়ে যান। এইটি এক ধরনের উপনিবেশিকবাদী চিন্তা। আমাদের মগজে চিন্তায় ও ভাবনায় উপনিবেশিকতা এখনও জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে আছে।

বাংলাদেশে সবকিছু রাজধানী কেন্দ্রিক। এটি এক ধরনের বলয়াবৃত্ত এর মত। চারপাশে ঘুরপাক খায়। একটু সচেতনভাবে দেখলে দেখবেন বছর শেষে জাতীয় দৈনিক সমূহে নাটকের যে সালতামামি প্রকাশ হয় সেখানে ঢাকার বাইরের নাটকের কোন খবর নেই বা থাকে না।

আজ থেকে অনেক বছর আগে হোটেল পূবাণীতে আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্র একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করেছিল। সেখানে সেমিনারে বিষয় ছিল : Theatre in Bangladesh. কিন্তু প্রাবন্ধিক বাংলাদেশের থিয়েটারের কথা বলতে গিয়ে শুধুমাত্র ঢাকার ৪-৫টি নাট্যদলের প্রযোজনার কথা উঠে এসেছিল। একটু অন্যভাবে বলি, বর্তমান সরকার যে বাৎসরিক অনুদান দিচ্ছে সেখানেও একই ধরনের মানসিকতা। ঢাকার দল ৭০ হাজার এবং জেলা শহরের দল ২৫ হাজার। কিন্তু নাটক নির্মাণ করতে কি দুই জায়গায় দুই রকম টাকা লাগে। খরচতো সব জায়গায় একই রকম্ ।

আমাদের থিয়েটারের দণ্ডমুণ্ড যাদের হাতে তারা কি বিষযটি একবারও ভেবেছেন। না ভাবেননি ! বরং তাচ্ছল্যের সাথে বলেন মফস্বলে নাটক করতে এত টাকা লাগবে কেন। অথচ যখন থিয়েটারের মোর্চ্চাগুলোর নির্বাচন আসে তখন এই মফস্বলের নাট্যকর্মিদের হাত চেপে ধরে ভোট চান এবং প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন। অর্থাৎ স্বার্থে ব্যবহার করেন এই মফস্বলের নাট্যকর্মিদের। আর তাতে খুশী হয়ে যান মফস্বলের নাট্যকর্মিরা। এই তাদের প্রাপ্তি। অথচ সারাদেশে সেসকল তুখোড় লড়াকু সৈনিকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কোন প্রকার লোভ লালসার বাইরে থেকে ঘরের খেয়ে থিয়েটার করে যাচ্ছেন নিয়মিত।

মফস্বলের নাট্যকর্মীরা একবার জেগে উঠুন, জানান দিন নিজেদের মেধা ও মননের কথা। আর কত ব্যবহৃত হবেন। ছুঁড়ে ফেলুন সব। আপন শক্তিতে উদ্ভাসিত করুন নিজেদের। জানান দিন নিজের অধিকারের কথা । আর কত ব্যবহৃত হবেন ???

২-৩ দিন আগে একটি সভায় একটি প্রশিক্ষণ বিষয়ে আলাপ হচ্ছিল । প্রশিক্ষক বিদেশী। তাই অনেকের অভিমত ঢাকার বাইরে এই ধরনের প্রশিক্ষণ আয়োজনের দরকার নেই। হায়রে দণ্ডমুণ্ডের কর্তাব্যক্তিরা ! কারণ জেলা শহরের নাট্যকর্মীরা মেধাসম্পন্ন না, তারা বুঝবে না। তারা ভালো ইংরেজি জানেন না। কি অকাট্য যুক্তি। আমি হাজারো জেলা শহর বা মফস্বলের নাট্যকর্মীর নাম বলতে পারব যারা ঢাকার নাট্যকর্মীদের চেয়ে অনেক মেধাসম্পন্ন এবং থিয়েটারটা প্রাণ দিয়ে করে ও ভালো ইংরেজি বলতে এবং লিকতে পারেন। সেদিনের সভায় যারা এই কথাগুলো বলছিলেন তারা আসলে কতটুকু জানেন তার ধারণা আমার কাছে নেই। শেকড় খুঁজতে গেলে দেখা যাবে তিনিও হয়তো একদিন তার নাট্যচর্চা শুরু করেছিলেন কোন এক জেলা শহর বা মফস্বলে।

আমি একজন জেলা শহরের নাট্যকর্মী। আমি গর্ব অনুভব করি। কারণ আমি নিয়মিত থিয়েটারটা করি। কোন সুবিদাবাদের কাছে আমি আত্মসমর্পন করিনি। জেলা ও মফস্বলের নাট্যকর্মীরা আছে বলেই বাংলাদেশের থিয়েটার বেঁচে আছে । না হলে কোথায় হারিয়ে যেত বাংলাদেশের থিয়েটার ….. । কোথায় হারিয়ে যেত দণ্ডমুণ্ডের কর্তাব্যক্তিদের নেতাগিরি ।

জয় হোক সেসকল লড়াকু সৈনিকদের যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মফস্বল বা জেলা শহরে নাট্যচর্চা করে বাংলাদেশের থিয়েটারকে সমৃদ্ধ করছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.