Banner Before Header

রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবলে পেশীশক্তি

প্রণব মজুমদার : ছন্দময় খেলা মানেই বিশ্বকাপ ফুটবল ! এ আসরে খেলোয়াড়দের ছন্দ ও গতিময় নৈপূন্যশৈলী ছিলো এক সময়। আর ফুটবলারদের ক্রীড়াকুশলী দৃষ্টিনন্দন কাজের জন্য বিশ্বকাপ ফুটবল বেশ জনপ্রিয়। নানা মহাদেশের বাছাইকরা ফুটবল দলগুলো নিয়ে ৪ বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবলের বর্ণাঢ্য আসর বসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নান্দনিক বিশ্ব ফুটবল খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ফুটবল পা এবং বলের খেলা ? অনেকেই বলছেন, এ বল করায়ত্ত করতে গিয়ে বেশি হচ্ছে ধাক্কাধাক্কি ও পেশীশক্তির অপব্যবহার! বল নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে খেলোয়াড়দের পেশীশক্তির আপত্তিজনক ব্যবহার বা অসদাচরণ বিশ্বকাপ ফুটবলেও বেশ লক্ষ্যণীয়।
দর্শক হিসেবে ১৯৮৬ সাল থেকে আমার বিশ্ব ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক। টেলিভিশনের মিনি পর্দায় নান্দনিক গতিময় ৮টি বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ হয়েছে ! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবন থেকে এ খেলা দেখা শুরু। ছেলেবেলা থেকে ফুটবল খেলা প্রিয় ব্যক্তি আমি। বিদ্যালয়ে পড়াশুনাকালে মফঃস্বল জেলা শহরে বেশি খেলতাম ফুটবল খেলা। সেই ফুটবলের টানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবনে সদলবলে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতাম রাত জেগে জেগে। এখনও সেই নেশা রয়েছে!
১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া ৪ বছর অন্তর বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের ২১তম পর্ব এবারের আসর। ফিফা বিশ্বকাপ রাশিয়া ২০১৮ আসরে সেমিফাইনাল পর্যন্ত মোট ১২টি ম্যাচ দেখেছি বেশ মনোযোগের সঙ্গে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় দর্শক হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণের ফলাফল সুখকর নয় ! বিশ্ব ফুটবলের তারকা খেলোয়াড়রাও তাদের সেরা নৈপূণ্য দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ক্রীড়াশৈলীর চেয়ে ফুটবলারদের দৃষ্টিকটু পেশীশক্তি এবং খারাপ আচরণই আমার চোখে পড়েছে বেশি।
বিশ্ব ফুটবলে ইটালীর পাওলো রসি, ডোনাডুনি, মালদিনি, ফ্রান্সের প্লাতিনি, জিনেদানে জিদান, ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার, ডেভিড ব্যাকহাম, মাইকেল ওয়েন, আজেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা, ডেনিয়েল বাতিস্তা, ক্যানিজিয়া, ব্রাজিলের জিকো, সক্রেটিস, ডুঙ্গা, রোমারিও, কাকা, রোনাল্ডো, পশ্চিম জার্মানীর রুডি ভলার, লোথার ম্যাথিউস, থমাস মুলার, ক্লোসা এবং ক্যামেরুনের রজার মিলারের যে চোখ জুড়ানো ক্রীড়াশৈলী দেখেছি সে রকম ‘ফেয়ার’ ও নান্দনিক ফুটবল কোথায় যেন হারিয়ে গেছে !
২০১৪ বিশ্বকাপের চেয়ে ফিফা বিশ্বকাপ রাশিয়া ২০১৮ আসরে ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়া সেমি ফাইনাল পর্যন্ত মোট ৬২টি খেলায় অসদাচরনের জন্য খেলোয়াড়দের ২১৩টি হলুদ কার্ড এবং মারাত্নক ফাউলের জন্য ৪টি লাল কার্ড দেখান রেফারীবৃন্দ! অথচ গেলো ফিফা বিশ্বকাপে রেফারীদের প্রদর্শিত মোট হলুদ কার্ডের সংখ্যা ছিলো ১৮৭। এবারের দ্বিতীয় সেমি ফাইনাল পর্যন্ত অংশগ্রহণকারি ৩২টি দেশের ফুটবলারগণ ফাউল করেছেন ১৬২৮টি, ১৬টি দল ১৬টি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের ফাউল সহ্য করেছেন ১৫৮৬টি। কলম্বিয়া বনাম জাপান মধ্যকার খেলায় মারাত্নকভাবে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে আঘাতের জন্য কলম্বিয়ার ফুটবলার কার্লোস সানচেজ মরিনো, রাশিয়া- উরুগুয়ে ম্যাচে স্বাগতিক রাশিয়ার ইগোর স্মলনিকভ, জার্মানী বনাম সুইডেন ম্যাচে জার্মানীর জেরোমি রোটেং এবং সুইজারল্যান্ড-সুইডেন মধ্যকার খেলায় সুইস খেলোয়াড় মাইকেল লাং লাল কার্ড পেয়েছেন। ২০১৮ আসরে ৩ বার হলুদ কার্ড পেয়ে মাঠ ছেড়েছেন সুইডেনের খেলোয়াড় সেবান্টাইন লার্সসন। বেশি হলুদ কার্ড প্রদর্শিত হয়েছে ৩টি ম্যাচে ! বেলজিয়াম-পানামা, ফ্রান্স-আর্জেন্টিনা, এবং ইংল্যান্ড বনাম কলম্বিয়া মধ্যে অনুষ্ঠিত খেলাতে সবচেয়ে বেশি অখেলোয়াড়সুলভ ব্যবহার করা হয়। এসব ম্যাচে অসদাচরণ আচরণের জন্য রেফারী মোট ৮টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন। এরমধ্যে তারকা বিশ্ব ফুটবলাররাও রয়েছেন। ফিফা বিশ্বকাপ রাশিয়া ২০১৮ আসরে সবচেয়ে বেশি হলুদ কার্ড পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া। সেমি ফাইনাল অবধি ১৪টি হলুদ কার্ড পেয়েছে তারা। তারপর আজেন্টিনা ও পানামা ১১টি করে। বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়া পেয়েছে ১০টি করে। স্বপ্নের ফাইনালে উত্তীর্ণ ক্রোয়েশিয়া সেমি ফাইনাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ফাউল করেছে। ৬টি ম্যাচে ফাউলের পরিসংখ্যান তাদের ১০১টি। তবে এ সময় অবধি তাদের খেলোয়াড়দের প্রতিপক্ষ দলের ফুটবলাররা ৯৩টি ফাউল করেছে। সেমি ফাইনালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে তাদের খেলার প্রথমার্ধের ৪ মিনিটে অধিনায়ক লুকা মদরিচ বিপদ সীমানায় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ডেলে আলিকে সজোড়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। বিপদ সীমানার কাছাকাছি এ ফাউলের জন্য খেসারত দিতে হয় ক্রোয়েশিয়াকে। ফ্রি কিক থেকে সরাসরি ক্রোয়েশিয়ার জালে বল পাঠান ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার কিরেন ট্রিপিয়ার। রাশিয়া বিশ্বকাপে সেমি ফাইনাল পর্যন্ত ৬টি ম্যাচ খেলেছে ক্রোয়েশিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ইংল্যান্ড। সবচেয়ে বেশি ফাউল করেছে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা ফ্রান্স ফুটবলারদের বিরুদ্ধে। ফ্রান্স দলের খেলোয়াড়দের ৭৯টি ফাউলের প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা করেছে ৯১টি ফাউল।
১৯৮৬ ’র বিশ্বকাপ জয়ী জনপ্রিয় দল আর্জেন্টিনা। এবারের আসরে নক আউট পর্বের প্রথম ম্যাচ আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্সের খেলায় আর্জেন্টিনা বাদ পড়ে যাবার অন্যতম প্রধান কারণ খেলোয়াড়দের বড় ধরনের চার্জ ! এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আলোচিত খেলোয়াড় টিনএজার স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপ্পে। অত্যন্ত ক্ষিপ্ত গতিসম্পন্ন এ তারকা ফুটবলার সে খেলায় প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার বিপদ সীমানা ডি বক্সে বল নিয়ে ঢুকে পড়েন। তাকে মারাত্নকভাবে চার্জ করেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার মার্কোস রজো। প্লেনাল্টি শট থেকে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে দলের প্রথম গোল করেন ফ্রান্স একাদশের স্ট্রাইকার আঁতোয়ান গ্রিজম্যান। এ প্লেনাল্টি গোলটি না হলে আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স মধ্যকার খেলার ফলাফল অন্য রকম হয়তো হতো !
ফাউলের কারণে স্বাভাবিক খেলা ব্যাহত হয়েছে ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড়দের। ৬টি ম্যাচে তারা ফাউল করেছে ৬৭টি, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়গণ তাদের বিরুদ্ধে রূঢ় আচরণ করেছে ৯০টি। কোয়ার্টার ও সেমি ফাইনালে প্রতিপক্ষ সুইডেন ও ক্রোয়েশিয়া দল বিশেষ করে রক্ষণভাগ কড়া পাহারায় রেখেছিলো ইংল্যান্ডের অধিনায়ক গোন্ডেন বুট প্রত্যাশী হ্যারিকেনকে। এজন্য তাকে বেশ আঘাতও করা হয়। দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে দৈহিক শক্তিরও বেশ ভাল প্রদর্শন করেছিল কলম্বিয়ার খেলোয়াড়রা এই ইংল্যান্ড দলের বিরুদ্ধেই। খেলার মাঠের বাইরেও এ শক্তি প্রদর্শন করে কলম্বিয়া।
বিশ্বকাপ ফুটবলে ৫ বারের কাপ বিজয়ী ছন্দময় আধুনিক ফুটবলশৈলী খ্যাত দল ব্রাজিল। এ দলের খেলোয়াড়রা দর্শক আশানুরূপ নান্দনিক ফুটবল এবার দেখাতে পারেননি। যদিও কড়া মার্কিংয়ে ছিলেন দলের তারকা খেলোয়াড়রা। ব্রাজিল দলের ফুটবলাররা ৫টি ম্যাচে মোট ফাউল করেছেন ৫৫টি। পক্ষান্তরে, সমান সংখ্যক ম্যাচে তাদের ফাউল করা হয়েছে ৭৩টি। যদিও এরমধ্যে ব্রাজিলের তারকা ফুটবলার নেইমারসহ ক’জনের অভিনয়ও দেখেছে বিশ্ব ফুটবল দর্শক। ফাউলের ফাঁদ ও নাট্যাভিনয় করায় তারকা খেলোয়াড় রাজিলের নেইমার, আর্জেন্টিনার মেসি, পর্তুগালের রোনান্ডো, ফ্রান্সের এমবাপ্পে ও উরুগুয়ের সুয়ারেজ হলুদ কার্ড পেয়েছেন।
এবারের বিশ্বকাপে অপ্রত্যাশিত ও অনাকাংখিত ঘটনার মধ্যে ছিলো বিশ্বকাপ ফুটবল লড়াইয়ে গ্রুপ পর্বে নাইজেরিয়া দলের বিপক্ষের খেলায় আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় মাসচেরানো আহত হওয়া ! আঘাতের কারণে চোখের কোনা থেকে প্রবাহিত রক্ত নিয়ে লড়াই করেছেন তিনি। খেলোয়াড়দের মধ্যে জার্সি টানাটানি হয়েছে বেশ। অশোভন ঘটনার মধ্যে ছিলো রাশিয়া বনাম ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার ম্যাচটি। ক্রোয়েশিয়ার একজন খেলোয়াড়ের শর্টস ছিড়ে ছিলেন রাশিয়ার খেলোয়াড়। ভ্যাগিস সেই খেলোয়াড়ের পরনে অন্তর্বাস ছিলো বলে রক্ষা ! বেলজিয়াম বনাম ফ্রান্সের খেলায় এমবাপ্পের জার্সি সজোড়ে টেনে ধরেন স্ট্রাইকার মারউএনে ফিল্লাইনি। ব্রাজিল বনাম বেলজিয়াম ম্যাচে নেইমারও জার্সি টানছেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের ।
বিশ্বকাপ জয়ী বড় বড় দলগুলো ছিটকে পড়েছে মূল পর্বের আসর থেকে। কারণ তারকাখচিত ফুটবলাররা কড়া নজরে ছিলেন প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের কাছে। এসব খেলোয়াড়ের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষ ফাউল করেছে যেমন বেশি, তেমন হলুদ কার্ডও পেয়েছে ঢের। তা বেশি ২০১৪ বিশ্বকাপের চেয়ে। তারণ্যের কাছে অভিজ্ঞ ফুটবলারদের পরাজয় দেখেছে গোটা ফুটবল দুনিয়া। পেশীশক্তির বিবাদময় আচরণে ছন্দ হারিয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ রাশিয়া ২০১৮।
আশাহত মানুষ পূণরায় স্বপ্ন দেখে আগামী সময় সাজায়। ফুটবলপ্রিয় আমিও তাই। যদি বেঁচে থাকি, তাহলে ৪ বছর পর ফিফা বিশ্বকাপ কাতার ২০২২ অনুষ্ঠিতব্য আসরে ৩২টি দেশের নান্দনিক ও ছন্দময় ফুটবল দেখার প্রত্যাশায় থাকবো।

লেখক সাহিত্যিক, পাক্ষিক অর্থকাগজ এর সম্পাদক এবং দৈনিক শিরোনাম (কুমিল্লা) এর ঢাকা ব্যুরো প্রধান
reporterpranab@gmail.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.